১২ই অক্টোবর: কলম্বাস ডে, যেভাবে আমেরিকা আবিষ্কৃত হল
০৩ রা অক্টোবর, ২০০৯ রাত ১:০৩
১৪৯২ সাল। সময়টা ক্যাথলিকদের জন্য অত্যন্ত শুভ। গ্রানাডা বিজয়ের আনন্দে মাতোয়ারা তারা তখন স্পেনে। রানী ইসাবেলা এবং রাজা ফার্ডিনান্ডের নেতৃত্বে ক্যাথলিকরা অবশেষে পরাভূত করতে পেরেছে মুসলিমদের। মুসলিমদের যে অযোগ্য নেতৃত্ব গ্রানাডাতে টিম টিম করে জ্বলছিল, তা সম্পূর্ন নির্বাপিত হয়ে স্পেনে আলোকিত হয়েছে ক্যাথলিকদের বিজয় মশাল।
এই শুভ ক্ষনে একজন ক্যাথলিক নাবিক কলম্বাস দেখা করতে চাইলেন রানী ইসাবেলার সাথে। রানীর সাথে কয়েক বছর আগেও তিনি দেখা করেছিলেন। কিন্তু সেবার রানীকে রাজী করাতে পারেন নি। কিন্তু এখনকার কথা তো আলাদা। এখন তো আমরা বিজয়ী। এখন নিশ্চয়ই রানী রাজী হবেন।
রানী সত্যিই রাজী হলেন কলম্বাসের কথায়। কলম্বাস তাকে আশা দিলেন পশ্চিমের নূতন গতিপথ দিয়ে ভারত আবিষ্কার করতে পারলে প্রচুর সম্পদ পৌছে যাবে রানীর কাছে। পশ্চিমের এ পথ হবে পূবের জ্ঞাত পথের চেয়ে সহজতর। এতে করে ক্যাথলিজম আরো কয়েক গুন বেশী প্রসারিত হবে। রানী যেন এ যাত্রায় সম্মতি দেন। তার যাত্রা পথের খরচ বহন করেন। রানীর পৃষ্ঠপোষকতার যে বড়ই প্রয়োজন।
রানী রাজি হলেন জাহাজের খরচ দিতে। প্রস্তুতি শেষ হল সান্তা মারিয়া, পিন্টা ও নিনার এবং সাথে সাথে সহযাত্রী ৮৭ জন নাবিকের। শুরু হল তাদের যাত্রা। আটলান্টিকের অসীম জলরাশি তাদের স্বাগত জানাল। কিন্তু হায়। যাত্রাপথের প্রতিকূলতা নাবিকদের সম্পূর্ন হতাশ করে দেয়। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। কোথাও স্থলভাগের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। কলম্বাস দুটো লগ বুক রাখতেন। গুপ্ত লগবুকে সত্যিকারের দূরত্ব লিপিবদ্ধ করতেন। আর প্রকাশ্য লগবুকে অনেক কম দূরত্ব দেখানো হত। কিন্তু এভাবে করে নাবিকদের খুব বেশী দিন ফাকি দেয়া গেল না। ১০শই অক্টোবর নাবিকেরা বিদ্রোহ করে বসল। কলম্বাস বিদ্রোহী নাবিকদের কথা দিলেন দুই দিনের মধ্যে ডাংগা দেখা না গেলে তিনি ফিরে যাবেন।
অক্টোবরের ১১ তারিখ। সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। আগের চেয়েও আরো বেশী পানি, চারিদিকে পানি, শুধু পানি। হঠাৎ একজন নাবিক দেখল পানিতে গাছের ডাল ভেসে আসছে। ডালে একদম সরস বেরী। ডাংগা!! খুব কাছে কোথাও রয়েছে ডাংগা!! তাদের হতাশ মনে আবারও জেগে উঠল আশা। কলম্বাস ঘোষনা দিলেন যে প্রথমে ডাংগা দেখবে, সেই লাভ করবে মূল্যবান উপহার সামগ্রী। সবাই অধীর হয়ে আছে ডাংগার জন্যে।
অক্টোবরের ১২ তারিখ। শুক্রবার ভোর দুইটা। রডরিগোয়েজ নামের নাবিকটি প্রথম ডাংগা দেখেন। কলম্বাস তার দলবল নিয়ে সেখানে অবতরন করে দ্বীপটির নামকরন করেন সান সালভাডোর দ্বীপ। এটি আজকের বাহামা দ্বীপপুন্জ্ঞের একটি। কলম্বাস ভাবলেন তিনি ভারতের কোথাও অবতরন করেছেন। কিন্তু এই ভারতীয়দের গায়ের রং যেন আলাদা - লাল বর্নের। তাই এদের ডাকলেন রেড ইন্ডিয়ানস। আমেরিকার আদিমতম অধিবাসীরা এভাবেই রেড ইন্ডিয়ান নামটি পেল।
দ্বীপের অধিবাসীরা নাবিকদের বেশ সম্মান জানালেন। কলম্বাস তার ডায়েরীতে লিখেছিলেন, "দ্বীপের অধিবাসীদের কোন ধর্ম নেই বলে মনে হচ্ছে, তাই তাদের খুব সহজে খ্রীষ্টান করা যাবে। আমি এখান থেকে ছয়জনকে নিয়ে যেতে চাই।"
কলম্বাস যখন পৌছুলেন স্পেনে তার দলবল, রেড ইন্ডিয়ান এবং সেখান থেকে নেয়া দ্রব্যাদি নিয়ে, ইসবেলা এবং ফার্ডিনান্ড তাদের আনন্দ চিত্তে বরন করলেন। এভাবে আবিষ্কৃত হল পশ্চিমের আরেকটি মহাদেশ, যোগসূত্র স্থাপিত হল ইউরোপের সাথে।
দুটি ভুলের কারনেই কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন। এক, তিনি ভেবেছিলেন পশ্চিম পথে ভারতের দূরত্বে পূর্ব পথে ভারতের দূরত্বের চেয়ে কম। দ্বিতীয়ত: তিনি ভাবতে পারেন নি পশ্চিমে আটলান্টিকের পরে আরেকটি মহাসাগর অপেক্ষা করছে। প্যাসিফিক পাড়ি দিয়ে ভারতে যেতে হবে। তাই তিনি যার দূরত্ব ৩০০০ মাইল ভেবেছিলেন, তা আসলে ১০০০০ মাইল।
কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেন ১২ই অক্টোবর। এই দিনটিকে প্রথম স্বীকৃতি দেন প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন রুজভেল্ট। যা আমেরিকাতে কলম্বাস ডে নামে পরিচিত।
ইন্ডিয়ানদের উদ্দেশ্যে দেয়া কলম্বাসের বক্তিতার অংশ:
"ইয়োর হাইনেস, যারা স্ক্রীশ্চানিজমকে ভালবাসেন, এবং তাকে বিস্তৃত দেখতে চান, যারা মোহাম্মদীয় বিশ্বাস এবং মূর্তিপূজার শত্রু, তারা আমাকে পাঠিয়েছেন ভারতের এই প্রান্তে, যাতে করে আমাদের পবিত্র বিশ্বাসে অধিবাসীরা ধর্মান্তরিত হতে পারে। আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে যাতে আমি পূবে না যাই, যা প্রচলিত এবং জ্ঞাত একটি পথ। আমি যাতে পশ্চিম ধরে এগোই, যা আজ পর্যন্ত হয়ে রয়েছে অজানা, যে পথে আমার আগে কেউ ভ্রমন করেনি।"
Friday, October 9, 2009
Friday, August 21, 2009
বীজগনিতের জনক আল খাওয়ারিজমী: জীবন যখন কর্মময়
[এর আগে প্রথম পর্ব দিয়েছিলাম। ষে হিসেবে এখন দ্বিতীয় পর্ব দেবার কথা। কিন্তু আগের পর্বে কিছু ভুল থাকায় ২য় পর্ব না দিয়ে পুরো লেখাটা একেবারে দিলাম।]
"হাউস অব উইসডম" এর স্কলার খাওয়ারিজমী:
সপ্তম শতকের শুরুটা মুসলিম সাম্রাজ্যের জন্য ছিল অত্যন্ত শুভ। অপ্রতিরোধ্য গতিতে এশিয়া ও আফ্রিকাতে তখন মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটতে শুরু করেছে। যার ফলাফল হিসেবে আরবরা তখন বিজিত গ্রীসের গনিত বিদ্যা এবং এস্ট্রোনমির সাথে পরিচিত হতে থাকে। মুসলিম বিশ্বে সেসময়টা বিজ্ঞানের সাধনা ছিল সমাদৃত এবং গৌরবময়, যার ফলে বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক - এই দুটি দিকেই মুসলিমদের অবদান দিন দিন বেড়ে চলছিল। এরই ধারাবাহিকতায় নবম শতকে আব্বাসীয় খলিফা হারুন অর রশিদ এবং তার পুত্র মামুন কর্তৃক বাগদাদে স্থাপিত হয় "হাউস অব উইসডম", বা "বাইতুল হিকমা" নামে একটি গ্রন্থাগার, যা ছিল তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম বিদ্যপীঠ। যা তৎকালীন ক্ষমতাসীন খলিফাদের দ্বারা ব্যপক পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে জ্ঞানী গুনীদের পৃষ্ঠপোষকতায় "বাইতুল হিকমা" হয়ে উঠে অনন্য এক বিদ্যাপীঠ। এমন কি বাইজেনটাইন সাম্রাজ্য থেকে বিতাড়িত জ্ঞানীদের আশ্রয় স্থল হয়ে উঠে এই "বাইতুল হিকমা"। যার ফলে ইউক্লিডিয়ান সহ বিভিন্ন গ্রীক লেখা আরবীতে অনুদিত হয়। এই অনুবাদ গুলো বিজ্ঞানের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্ববহ কারন এর দ্বারাই অনেক মৌলিক গ্রীক রচনা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। এসময়টাতে একদিকে ইউরোপে চলছিল বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যতা, আর অন্য পাশে ছিল বর্বরতা এবং রাজনৈতিক দোদুল্যমনতা। যার ফলে এই কালোত্তীর্ন রচনাগুলোর বিলুপ্তি হওয়াটা কোন অসম্ভব বিষয় ছিল না। ইউরোপের পশ্চাদপদতার শূন্যস্থান পূরন হয় আরবদের এই মহতী উদ্যোগ দ্বারা। বলা চলে এগারশ শতক পর্যন্ত পৃথিবীতে গনিতের সমস্ত মৌলিক অবদানের পেছনে ছিলেন মুসলিম বিজ্ঞানীরা। বারশত শতক থেকে অন্যান্যরা মুসলিমদের এসব অবদানকে আরবী থেকে ল্যাটিন ও হিব্রুতে অনুবাদ করতে থাকে। তেরশত শতক পর্যন্ত মুসলিমদের সমমানের কোন অবদান পশ্চিমে দেখা যায় নি।
"হাউস অব উইসডম" এর এরকমই একজন স্কলার ছিলেন বাগদাদের মোহাম্মদ বিন মুসা, যিনি জন্মস্থানের নাম অনুযায়ী আলখাওয়ারিজমী নামে পরিচিত। তার জীবন সম্পর্কে খুব বেশী কিছু জানা যায় না। ধারনা করা হয় তিনি ৮৫০ শতকে ইন্তেকাল করেন। খলিফা মামুন তাকে "হাউস অব উইসডম" এ নিয়োগ দেন। এখানে তিনি গ্রীক ও সংস্কৃত বৈজ্ঞানিক শাস্ত্রের অনুবাদ অধ্যয়ন করেন। এই সম্মান ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদর্শনের জন্য তিনি মামুনের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকেন এবং নিজের রচিত অধিকাংশ বই খলিফা মামুনকে উৎসর্গ করেন। খলিফা মামুনও তার পারিশ্রমিক পরিশোধে কার্পন্য করেন নি।
বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় খাওয়ারিজমীর বৈপ্লবিক অবদানসমূহ:
এই যুগশ্রেষ্ঠ গনিতবিদ "এলজাব্রা" এবং "এলগরিদম" এর জনক, যার সাথে আজকের যুগে আমরা কমবেশী সবাই পরিচিত। গনিত শাস্ত্রে গুরুত্বপূর্ন ঐতিহাসিক অবদানের মাধ্যমে তিনি বরনীয় হয়ে আছেন। এরিথমেটিক ও এলজাব্রার উপর খাওয়ারিজমীর অন্যতম একটি বইয়ের ল্যাটিন ট্রান্সলেশন "অন দ্য হিন্দু আর্ট অব রেকনিং"। বারশত শতকে তার বইয়ের ল্যাটিন অনুবাদের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্ব দশমিক সংখ্যা সিস্টেমের সাথে পরিচিত হয়। ল্যাটিনে অনুবাদ হয় "এলগোরিটমি দ্য নিউমারো ইনডোরাম" নামে। আল খাওয়ারিজমী, যাকে ল্যাটিনে "এলগোরিটমি" বলা হয়, তা থেকেই "এলগোরিদম" নামটি আসে। এই বইতে তিনি ভারতীয় সংখ্যা তত্ত্বের ব্যাখা দেন। প্রথম নয়টি সংখ্যাকে নয়টি প্রতীক এবং শূন্যকে বৃত্ত দিয়ে প্রকাশ করেন। শূন্য শব্দটি এসেছে আরবী "সিফর" থেকে যার অর্থ "শূন্য স্থান" এবং এই "সিফর" থেকে আসা শব্দ "সাইফার" যা এখন সিকিউরিটিতে বহুল ব্যবহৃত শব্দ। খাওয়ারিজমী হিন্দু শব্দ "শুণিয়া"কে আরবী অনুবাদ করেন "সিফর"। খাওয়ারিজম কর্তৃক শূন্যের প্রয়োগ ও সংখ্যার স্থানীয় স্বকীয় মানের পার্থক্যের কারনেই আজকের নম্বর সিস্টেম উদ্ভাবিত হতে পারে। সংখ্যা শাস্ত্রে তাই "শূন্য" একটি গুরুত্ব পূর্ন সংখ্যা। আবার একই সংখ্যা শতকের ঘরে থাকলে তার স্থানীয় মান এককের ঘরের চেয়ে আলাদা হয়ে থাকে। যার ফলে অনেক বিশাল বিশাল সংখ্যার প্রকাশ সহজ হয়ে যায়। এই নম্বর সিস্টেম পরবর্তীতে খাওয়ারিজমীর বইয়ের অনুবাদের মাধ্যমে ইউরোপে পরিচিতি পায়। গনিত শাস্ত্রের জন্য এটা ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। আরব সংখ্যার পূর্বে পশ্চিমে প্রচলিত ছিল রোমান সংখ্যা, যা সংখ্যার প্রকাশে খুব বেশী কার্যকরী নয়। "২৮৪৩"কে মাত্র চারটি আরব সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা যাচ্ছে। অথচ রোমান নিয়ম অনুযায়ী তা হল "MMDCCCXLIII" - যার জন্য প্রয়োজন এগারটি সংখ্যার!!!!
খাওয়ারিজমী খলিফা মামুন কর্তৃক পৃথিবীর পরিধি ও ম্যাপ নির্নয়ের নিমিত্ত যে প্রজেক্ট নেয়া হয়েছিল, তার একজন ছিলেন। তিনি টলেমীর জিওগ্রাফী উপর পড়াশোনা করে টলেমীর দেয়া আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূগোলক ডেটাকে সংশোধন করেন। বিশেষত টলেমী ভূমধ্য সাগরের দৈর্ঘ্য অতিরিক্ত দেখান, যা খাওয়ারিজমী শুদ্ধ করে সঠিক ভাবে বর্ননা করেন। তার আরেকটি বই হচ্ছে "কিতাব সুরাত আল আরদ" বা "দ্য ইমেজ অব দ্য আর্থ", যাতে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের কো-অর্ডিনেট দেয়া হয়। এটা টলেমীর জিওগ্রাফীর উপর ভিত্তি করে হলেও তিনি ভূমধ্য সাগর, এশিয়া ও আফ্রিকার উপর বেশী গ্রহনযোগ্য ডাটা দেন। তিনি ও তার সতীর্থরা টেরেস্ট্রিয়াল ডিগ্রী (আকাশের এক ডিগ্রী কোনের জন্য পৃথিবীতে সৃষ্ট চাপের দৈর্ঘ্য) পরিমাপ করে পৃথিবীর ব্যাস ও পরিধি নির্নয় করেন। যার মান ছিল: পরিধি - ২০৪০০ মাইল এবং ব্যাস ৬৫০০ মাইল। প্রকৃত পক্ষে পৃথিবীর পরিধি ২৪৯০২ মাইল এবং ইকুয়েটর এলাকার ব্যাস ৭৯০০ মাইল। এই হিসাব পদ্ধতি থেকে অনুমান করা যায় পৃথিবীর গোলত্ব সম্পর্কে তাদের ধারনা ছিল।
তিনি কোনিক সেকশনের সঠিক জ্যামিতিক গঠন প্রনালী উদ্ভাবন করেন। এছাড়া ক্যালকুলাস ইত্যাদির উপরে মৌলিক অবদান রাখেন। যা থেকে পরবর্তীতে ডিফারেন্সিয়েশনের উদ্ভব হয়। খাওয়ারিজমী ইহুদী ক্যালেন্ডার, সূর্য ঘড়ি এবং এস্ট্রোলবের ব্যবহার ই্ত্যাদির উপর গবেষনা করে কয়েকটি বই লিখেন। তবে এসব অনেক বইয়ের কোন হদিস পাওয়া যায় নি। তিনি প্রায় একশত এস্ট্রোনমিক্যাল টেবল লিপিবদ্ধ করেন। শূন্যের ব্যাখা ও প্রয়োগ, সাইন ফাংশনের টেবল উদ্ভাবন সহ এস্ট্রোনমিতে বহু গুরুত্ব বহ অবদান রাখেন খাওয়ারিজমী। তার দেয়া সাইন ফাংশন পরবর্তীতে ট্যানজেন্ট ফাংশন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এস্ট্রোনমির উপর তার অবদানের কারনে তিনি সমসাময়িক কালে দ্রূত পরিচিতি পান। তার আরেকটি বই "আল-জাবরি ওয়া আল-মুকাবালাহ"তে এলজাব্রা গনিতের বিভিন্ন কনসেপ্টগুলো ব্যাখা করেন।
এলজাব্রার জনক খাওয়ারিজমী যেভাবে এলজাব্রার সূচনা করেন:
মূলত এস্টোনোমার হলেও খাওয়ারিজমী বেশী পরিচিত এলজাব্রার জনক হিসেবে। গ্রীকদের জিওমেট্রি ভিত্তিক গনিত শাস্ত্র থেকে এক ধাপ উত্তরন হচ্ছে এলজাব্রা - যার উদ্ভাবক খাওয়ারিজমী। আজকের বিশ্বে গনিতের মূল স্তম্ভ হয়ে দাড়িয়েছে এলজাব্রা। এলজাব্রার উপর খাওয়ারিজমীর মাইলস্টোন পুস্তকের আরবী নাম "আল কিতাব আল মুখতাসার ফি হিসাব আল জবর ওয়াল মুকাবালা"। ইংরেজীতে "The Compendious Book on Calculation by Completion and Balancing"। বাংলায় "তুলনা ও অবশেষের মাধ্যমে গননার সার সংক্ষেপ"। বইটির ল্যাটিন অনুবাদ ১৮৫৭ সালে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে উদ্ধার হয়। বইটির শুরু হয়েছে স্রষ্টার প্রতি ভক্তি জানিয়ে।
"এলজাব্রা" শব্দটি এসেছে "আল জবর" থেকে, যা এই বইয়ের অন্যতম প্রতিপাদ্য। মূল আরবী ক্রিয়াপদ "জাবারা", যার অর্থ "একত্রীকরন"। দ্বিঘাত সমীকরনকে সমাধান করার জন্য তিনি দুটো পদ্ধতি দেখান, যার একটি হল "আল জবর"। "আল জবর" এর শাব্দিক অর্থ সংক্ষিপ্তকরন, যাতে একটি ইকুয়েশনের দুই পাশে একই টার্ম যোগ করে নেগেটিভ টার্ম বাদ দেয়া এবং ইকুয়েশনের দুই পাশকে একই ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করে ভগ্নাংশ মুক্ত করা হয়। "আল জবর" বা "সংক্ষিপ্ত করন" অপারেশনে একটি নেগেটিভ সংখ্যাকে ইকুয়েশনের অন্যপাশে নিয়ে তাকে পজিটিভ করা হয়। "আল মুকালাবা" শব্দটির অর্থ হচ্ছে তুলনা করা, অর্থ্যাৎ ইকুয়েশনের দুই পাশকে তুলনা করা। আরবী ভাষায় "আল জবর ওয়াল মুকাবালা" কথাটির মানে হচ্ছে "যেভাবে অ্যালজাব্রা কষতে হয়" বা "সাইন্স অব অ্যালজাব্রা"।
বইটিতে প্রথমে ছয়টি মূল ইকুয়েশনকে বিল্ডিং ব্লক হিসেবে রাখা হয়। যে কোন দ্বিঘাত সমীকরনের সমাধান কল্পে ইকুয়েশনটিকে সংক্ষেপ করে ছয়টি মূল ইকুয়েশনের যে কোন একটিতে ফেলা হয়। এখানে উল্লেখ্য আজকের দিনে ইকুয়েশনকে যেভাবে ভেরিয়েবল দিয়ে প্রকাশ করা হয়, খাওয়ারিজমী কিন্তু সেভাবে প্রকাশ করেন নি। খাওয়ারিজমীর প্রকাশ ভংগি শাব্দিক, এমন কি সংখ্যাগুলো পর্যন্ত শব্দে লেখা - "বিয়াল্লিশ" বা "চল্লিশ" এভাবে। ইকুয়েশনকে শাব্দিকভাবে প্রকাশের জন্য তিনি যেসব টার্ম বেছে নেন, তা হল "স্কয়ার" (x**2), "রুট" (x) ও "সংখ্যা" (৪২)। তার দেয়া ছয়টি মূল ইকুয়েশনকে আজকের এলজাব্রায় প্রচলিত সিম্বলের মাধ্যমে নিম্নোক্ত উপায়ে লেখা যায়:
স্কয়ার যখন রুটের সমান: ax**2 = bx
স্কয়ার যখন সংখ্যার সমান: ax**2 = c
রুট যখন সংখ্যার সমান: bx = c
স্কয়ার এবং রুট যখন সংখ্যার সমান: ax**2 + bx = c
স্কয়ার এবং সংখ্যা যখন রুটের সমান: ax**2 + c = bx
রুট ও সংখ্যা যখন স্কয়ারের সমান: bx + c = ax**2
যে কোন ইকুয়েশনকে সরলীকরন করার পর এই ছয়টির একটিতে তিনি ফেলেন। তারপর বিভিন্ন জিওমেট্রিক ও এলজাব্রিক উপায়ে ইকুয়েশনের সমাধানে পৌছেন।
আল খাওয়ারিজমীর উদাহরন দেন: x**2 = 40x − 4x**2 কে পরিবর্তন করা যায় 5x**2 = 40x. এই অপারেশনটির পুন: পুন: প্রয়োগ দ্বারা ইকুয়েশন থেকে নেগেটিভ টার্মকে বিদায় করে দেয়া যায়। অন্যদিকে "আল মুকাবালা" বা "ব্যালেন্স" অপারেশন হচ্ছে ইকুয়েশনের দুই পাশ থেকে একই রাশি বিয়োগ দেয়া। যার ফলে, x**2 + 5 = 40x + 4x**2 হয়ে যায় is 5 = 40x + 3x**2। এরকম পুন পুন অপারেশনের মাধ্যমে স্কয়ার, রুট কিংবা সংখ্যা একটি ইকুয়েশনে মাত্র একবার করে আসে। ফলে উপরে উল্লিখিত ছয়টি সমাধান যোগ্য সমীকরনের একটিতে ফেলা সম্ভব হয়ে থাকে।
এই বইয়ের পরবর্তী অংশে কিছু বাস্তব উদাহরনের সমাধান দেয়া হয়েছে উপরের নিয়ম নীতিকে অনুসরন করে। এছাড়া ক্ষেত্র ও আয়তনের কিছু সমস্যার সমাধান রয়েছে। শেষ অংশে রয়েছে মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের কিছু উদাহরন ও তা সম্পর্কিত বাস্তব সমস্যার সমাধান।
খাওয়ারিজমীর প্রসংগে বিভিন্ন স্কলারদের মূল্যায়ন:
জে ও কনর এবং রবার্টসন ম্যাক টিউটর হিস্টরী অব ম্যাথমেটিক্স এর আর্কাইভে লেখেন:
"আল খাওয়ারিজমীর নূতন আইডিয়া গ্রীক গনিতের থেকে এক বৈপ্লবিক উত্তরন, কারন গ্রীক গনিত শাস্ত্র মূলত জিওমেট্রি বেসড। ......এলজাব্রা গনিত শাস্ত্রকে একটি নূতন উন্নত পথ দেখিয়েছে যা কনসেপ্টের দিক দিয়ে অতীতের চেয়ে অনেক বিস্তৃত, এবং যা ভবিষ্যৎ উন্নয়নের কারিগড়। "
ফিলিপ হাইটির ভাষ্য:
"তিনি অন্য যে কোন মধ্য যুগীয় লেখকের চেয়ে গনিতের চিন্তাধারার উপর অনেক বেশী অবদান রাখেন।"
ইতিহাসবেত্তা জর্জ সারটুন নবম শতকের প্রথম অর্ধেককে নির্দিষ্ট করে দেন খাওয়ারিজমীর জন্যে।
একজন বিশ্বাসী হিসেবে খাওয়ারিজমী:
তিনি তার অবদানের জন্য খলিফা মামুনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে লিখেছিলেন:
"আমিরুল মুমিনিন আল মামুনকে আল্লাহ বিজ্ঞানের প্রতি আসক্তি উপহার দিয়ে ধন্য করেছেন। যে বন্ধুত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা তিনি জ্ঞানীদের প্রতি প্রদর্শন করেন, যে দ্রুততার সাথে তিনি কাঠিন্যকে সহজ করতে এবং দুর্বোধ্যকে বোধগম্য করতে সাহায্য করে থাকেন - তাই আমাকে আল জবর ও আল মুকাবালা রচনা করতে অনুপ্রানিত করেছে, যা কি না সংখ্যা শাস্ত্রের জন্য সবচেয়ে সহজ এবং দরকারী। "
- আল খাওয়ারিজমী।
(That fondness for science, by which God has distinguished the IMAN AL MAMUN, the commander of the faithful, that affability and condescension which God shows to the learned, that promptitude with which he protects and supports them in the elucidation of obscurities and in the removal of difficulties, has encouraged me to compose a short work on calculating by al-Jabr [algebra] and al-Muqabala, confining it to what is easiest and most useful in arithmetic).
একজন একনিষ্ঠ মুসলিমের মতই আল খাওয়ারিজমীও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তার অবদানকে স্রষ্টার উপহার বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। খাওয়ারিজমীর বইয়ের মুখবন্ধ শুরু হয়েছে লেখকের পরিচয় ও বৃত্তান্ত দিয়ে -
মোহাম্মদ বিন মুসা, রাদি আল্লাহু আনহু ওয়া আথাবাহু ওয়া রাহেমা, অর্থ্যাৎ আল্লাহ মোহাম্মদ বিন মুসার উপর সন্তুষ্ট থাকুন এবং রহম করুন।
তিনি তার অবদানের জন্য আল্লাহর যেভাবে সন্তুষ্টি কামনা করেছেন, আমরাও উনার জন্য অনুরূপ প্রার্থনা করছি। আল্লাহ যেন তার আত্মার মাগফেরাত দেন এবং তাকে জান্নাতে দাখিল করেন।
===========================================
রেফারেন্স সাইট:
http://en.wikipedia.org/wiki/The_Compen … _Balancing
http://en.wikipedia.org/wiki/Muhammad_i … -Khwārizmī
http://knowledgerush.com/kr/encyclopedia/Al-Khawarizmi/
http://www.iidl.net/pdf/science/53359697.pdf
http://www.math10.com/en/maths-history/ … ardo2.html
http://www.muslimheritage.com/topics/de … icleID=317
http://books.google.com/books?id=8uEFaP … mp;f=false
পুনশ্চ: লেখাটির জন্য রেফারেন্স হিসেবে সবচেয়ে ডিটেইল বইটি হল: "গ্রেট মুনলিম ম্যাথমেটিশিয়ানস"। লিখেছেন "মোহাইনি মোহামেদ"। তিনি মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির এসোসিয়েট অধ্যাপিকা। http://books.google.com/books?id=8uEFaP … mp;f=false
যারা মালয়েশিয়া থাকেন, তারা কি উনার নাম শুনেছেন?
Last edited by ummu (গতকাল 22:01:40)
"হাউস অব উইসডম" এর স্কলার খাওয়ারিজমী:
সপ্তম শতকের শুরুটা মুসলিম সাম্রাজ্যের জন্য ছিল অত্যন্ত শুভ। অপ্রতিরোধ্য গতিতে এশিয়া ও আফ্রিকাতে তখন মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটতে শুরু করেছে। যার ফলাফল হিসেবে আরবরা তখন বিজিত গ্রীসের গনিত বিদ্যা এবং এস্ট্রোনমির সাথে পরিচিত হতে থাকে। মুসলিম বিশ্বে সেসময়টা বিজ্ঞানের সাধনা ছিল সমাদৃত এবং গৌরবময়, যার ফলে বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক - এই দুটি দিকেই মুসলিমদের অবদান দিন দিন বেড়ে চলছিল। এরই ধারাবাহিকতায় নবম শতকে আব্বাসীয় খলিফা হারুন অর রশিদ এবং তার পুত্র মামুন কর্তৃক বাগদাদে স্থাপিত হয় "হাউস অব উইসডম", বা "বাইতুল হিকমা" নামে একটি গ্রন্থাগার, যা ছিল তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম বিদ্যপীঠ। যা তৎকালীন ক্ষমতাসীন খলিফাদের দ্বারা ব্যপক পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে জ্ঞানী গুনীদের পৃষ্ঠপোষকতায় "বাইতুল হিকমা" হয়ে উঠে অনন্য এক বিদ্যাপীঠ। এমন কি বাইজেনটাইন সাম্রাজ্য থেকে বিতাড়িত জ্ঞানীদের আশ্রয় স্থল হয়ে উঠে এই "বাইতুল হিকমা"। যার ফলে ইউক্লিডিয়ান সহ বিভিন্ন গ্রীক লেখা আরবীতে অনুদিত হয়। এই অনুবাদ গুলো বিজ্ঞানের জন্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্ববহ কারন এর দ্বারাই অনেক মৌলিক গ্রীক রচনা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। এসময়টাতে একদিকে ইউরোপে চলছিল বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যতা, আর অন্য পাশে ছিল বর্বরতা এবং রাজনৈতিক দোদুল্যমনতা। যার ফলে এই কালোত্তীর্ন রচনাগুলোর বিলুপ্তি হওয়াটা কোন অসম্ভব বিষয় ছিল না। ইউরোপের পশ্চাদপদতার শূন্যস্থান পূরন হয় আরবদের এই মহতী উদ্যোগ দ্বারা। বলা চলে এগারশ শতক পর্যন্ত পৃথিবীতে গনিতের সমস্ত মৌলিক অবদানের পেছনে ছিলেন মুসলিম বিজ্ঞানীরা। বারশত শতক থেকে অন্যান্যরা মুসলিমদের এসব অবদানকে আরবী থেকে ল্যাটিন ও হিব্রুতে অনুবাদ করতে থাকে। তেরশত শতক পর্যন্ত মুসলিমদের সমমানের কোন অবদান পশ্চিমে দেখা যায় নি।
"হাউস অব উইসডম" এর এরকমই একজন স্কলার ছিলেন বাগদাদের মোহাম্মদ বিন মুসা, যিনি জন্মস্থানের নাম অনুযায়ী আলখাওয়ারিজমী নামে পরিচিত। তার জীবন সম্পর্কে খুব বেশী কিছু জানা যায় না। ধারনা করা হয় তিনি ৮৫০ শতকে ইন্তেকাল করেন। খলিফা মামুন তাকে "হাউস অব উইসডম" এ নিয়োগ দেন। এখানে তিনি গ্রীক ও সংস্কৃত বৈজ্ঞানিক শাস্ত্রের অনুবাদ অধ্যয়ন করেন। এই সম্মান ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রদর্শনের জন্য তিনি মামুনের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকেন এবং নিজের রচিত অধিকাংশ বই খলিফা মামুনকে উৎসর্গ করেন। খলিফা মামুনও তার পারিশ্রমিক পরিশোধে কার্পন্য করেন নি।
বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় খাওয়ারিজমীর বৈপ্লবিক অবদানসমূহ:
এই যুগশ্রেষ্ঠ গনিতবিদ "এলজাব্রা" এবং "এলগরিদম" এর জনক, যার সাথে আজকের যুগে আমরা কমবেশী সবাই পরিচিত। গনিত শাস্ত্রে গুরুত্বপূর্ন ঐতিহাসিক অবদানের মাধ্যমে তিনি বরনীয় হয়ে আছেন। এরিথমেটিক ও এলজাব্রার উপর খাওয়ারিজমীর অন্যতম একটি বইয়ের ল্যাটিন ট্রান্সলেশন "অন দ্য হিন্দু আর্ট অব রেকনিং"। বারশত শতকে তার বইয়ের ল্যাটিন অনুবাদের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্ব দশমিক সংখ্যা সিস্টেমের সাথে পরিচিত হয়। ল্যাটিনে অনুবাদ হয় "এলগোরিটমি দ্য নিউমারো ইনডোরাম" নামে। আল খাওয়ারিজমী, যাকে ল্যাটিনে "এলগোরিটমি" বলা হয়, তা থেকেই "এলগোরিদম" নামটি আসে। এই বইতে তিনি ভারতীয় সংখ্যা তত্ত্বের ব্যাখা দেন। প্রথম নয়টি সংখ্যাকে নয়টি প্রতীক এবং শূন্যকে বৃত্ত দিয়ে প্রকাশ করেন। শূন্য শব্দটি এসেছে আরবী "সিফর" থেকে যার অর্থ "শূন্য স্থান" এবং এই "সিফর" থেকে আসা শব্দ "সাইফার" যা এখন সিকিউরিটিতে বহুল ব্যবহৃত শব্দ। খাওয়ারিজমী হিন্দু শব্দ "শুণিয়া"কে আরবী অনুবাদ করেন "সিফর"। খাওয়ারিজম কর্তৃক শূন্যের প্রয়োগ ও সংখ্যার স্থানীয় স্বকীয় মানের পার্থক্যের কারনেই আজকের নম্বর সিস্টেম উদ্ভাবিত হতে পারে। সংখ্যা শাস্ত্রে তাই "শূন্য" একটি গুরুত্ব পূর্ন সংখ্যা। আবার একই সংখ্যা শতকের ঘরে থাকলে তার স্থানীয় মান এককের ঘরের চেয়ে আলাদা হয়ে থাকে। যার ফলে অনেক বিশাল বিশাল সংখ্যার প্রকাশ সহজ হয়ে যায়। এই নম্বর সিস্টেম পরবর্তীতে খাওয়ারিজমীর বইয়ের অনুবাদের মাধ্যমে ইউরোপে পরিচিতি পায়। গনিত শাস্ত্রের জন্য এটা ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। আরব সংখ্যার পূর্বে পশ্চিমে প্রচলিত ছিল রোমান সংখ্যা, যা সংখ্যার প্রকাশে খুব বেশী কার্যকরী নয়। "২৮৪৩"কে মাত্র চারটি আরব সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা যাচ্ছে। অথচ রোমান নিয়ম অনুযায়ী তা হল "MMDCCCXLIII" - যার জন্য প্রয়োজন এগারটি সংখ্যার!!!!
খাওয়ারিজমী খলিফা মামুন কর্তৃক পৃথিবীর পরিধি ও ম্যাপ নির্নয়ের নিমিত্ত যে প্রজেক্ট নেয়া হয়েছিল, তার একজন ছিলেন। তিনি টলেমীর জিওগ্রাফী উপর পড়াশোনা করে টলেমীর দেয়া আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূগোলক ডেটাকে সংশোধন করেন। বিশেষত টলেমী ভূমধ্য সাগরের দৈর্ঘ্য অতিরিক্ত দেখান, যা খাওয়ারিজমী শুদ্ধ করে সঠিক ভাবে বর্ননা করেন। তার আরেকটি বই হচ্ছে "কিতাব সুরাত আল আরদ" বা "দ্য ইমেজ অব দ্য আর্থ", যাতে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের কো-অর্ডিনেট দেয়া হয়। এটা টলেমীর জিওগ্রাফীর উপর ভিত্তি করে হলেও তিনি ভূমধ্য সাগর, এশিয়া ও আফ্রিকার উপর বেশী গ্রহনযোগ্য ডাটা দেন। তিনি ও তার সতীর্থরা টেরেস্ট্রিয়াল ডিগ্রী (আকাশের এক ডিগ্রী কোনের জন্য পৃথিবীতে সৃষ্ট চাপের দৈর্ঘ্য) পরিমাপ করে পৃথিবীর ব্যাস ও পরিধি নির্নয় করেন। যার মান ছিল: পরিধি - ২০৪০০ মাইল এবং ব্যাস ৬৫০০ মাইল। প্রকৃত পক্ষে পৃথিবীর পরিধি ২৪৯০২ মাইল এবং ইকুয়েটর এলাকার ব্যাস ৭৯০০ মাইল। এই হিসাব পদ্ধতি থেকে অনুমান করা যায় পৃথিবীর গোলত্ব সম্পর্কে তাদের ধারনা ছিল।
তিনি কোনিক সেকশনের সঠিক জ্যামিতিক গঠন প্রনালী উদ্ভাবন করেন। এছাড়া ক্যালকুলাস ইত্যাদির উপরে মৌলিক অবদান রাখেন। যা থেকে পরবর্তীতে ডিফারেন্সিয়েশনের উদ্ভব হয়। খাওয়ারিজমী ইহুদী ক্যালেন্ডার, সূর্য ঘড়ি এবং এস্ট্রোলবের ব্যবহার ই্ত্যাদির উপর গবেষনা করে কয়েকটি বই লিখেন। তবে এসব অনেক বইয়ের কোন হদিস পাওয়া যায় নি। তিনি প্রায় একশত এস্ট্রোনমিক্যাল টেবল লিপিবদ্ধ করেন। শূন্যের ব্যাখা ও প্রয়োগ, সাইন ফাংশনের টেবল উদ্ভাবন সহ এস্ট্রোনমিতে বহু গুরুত্ব বহ অবদান রাখেন খাওয়ারিজমী। তার দেয়া সাইন ফাংশন পরবর্তীতে ট্যানজেন্ট ফাংশন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এস্ট্রোনমির উপর তার অবদানের কারনে তিনি সমসাময়িক কালে দ্রূত পরিচিতি পান। তার আরেকটি বই "আল-জাবরি ওয়া আল-মুকাবালাহ"তে এলজাব্রা গনিতের বিভিন্ন কনসেপ্টগুলো ব্যাখা করেন।
এলজাব্রার জনক খাওয়ারিজমী যেভাবে এলজাব্রার সূচনা করেন:
মূলত এস্টোনোমার হলেও খাওয়ারিজমী বেশী পরিচিত এলজাব্রার জনক হিসেবে। গ্রীকদের জিওমেট্রি ভিত্তিক গনিত শাস্ত্র থেকে এক ধাপ উত্তরন হচ্ছে এলজাব্রা - যার উদ্ভাবক খাওয়ারিজমী। আজকের বিশ্বে গনিতের মূল স্তম্ভ হয়ে দাড়িয়েছে এলজাব্রা। এলজাব্রার উপর খাওয়ারিজমীর মাইলস্টোন পুস্তকের আরবী নাম "আল কিতাব আল মুখতাসার ফি হিসাব আল জবর ওয়াল মুকাবালা"। ইংরেজীতে "The Compendious Book on Calculation by Completion and Balancing"। বাংলায় "তুলনা ও অবশেষের মাধ্যমে গননার সার সংক্ষেপ"। বইটির ল্যাটিন অনুবাদ ১৮৫৭ সালে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে উদ্ধার হয়। বইটির শুরু হয়েছে স্রষ্টার প্রতি ভক্তি জানিয়ে।
"এলজাব্রা" শব্দটি এসেছে "আল জবর" থেকে, যা এই বইয়ের অন্যতম প্রতিপাদ্য। মূল আরবী ক্রিয়াপদ "জাবারা", যার অর্থ "একত্রীকরন"। দ্বিঘাত সমীকরনকে সমাধান করার জন্য তিনি দুটো পদ্ধতি দেখান, যার একটি হল "আল জবর"। "আল জবর" এর শাব্দিক অর্থ সংক্ষিপ্তকরন, যাতে একটি ইকুয়েশনের দুই পাশে একই টার্ম যোগ করে নেগেটিভ টার্ম বাদ দেয়া এবং ইকুয়েশনের দুই পাশকে একই ফ্যাক্টর দিয়ে গুন করে ভগ্নাংশ মুক্ত করা হয়। "আল জবর" বা "সংক্ষিপ্ত করন" অপারেশনে একটি নেগেটিভ সংখ্যাকে ইকুয়েশনের অন্যপাশে নিয়ে তাকে পজিটিভ করা হয়। "আল মুকালাবা" শব্দটির অর্থ হচ্ছে তুলনা করা, অর্থ্যাৎ ইকুয়েশনের দুই পাশকে তুলনা করা। আরবী ভাষায় "আল জবর ওয়াল মুকাবালা" কথাটির মানে হচ্ছে "যেভাবে অ্যালজাব্রা কষতে হয়" বা "সাইন্স অব অ্যালজাব্রা"।
বইটিতে প্রথমে ছয়টি মূল ইকুয়েশনকে বিল্ডিং ব্লক হিসেবে রাখা হয়। যে কোন দ্বিঘাত সমীকরনের সমাধান কল্পে ইকুয়েশনটিকে সংক্ষেপ করে ছয়টি মূল ইকুয়েশনের যে কোন একটিতে ফেলা হয়। এখানে উল্লেখ্য আজকের দিনে ইকুয়েশনকে যেভাবে ভেরিয়েবল দিয়ে প্রকাশ করা হয়, খাওয়ারিজমী কিন্তু সেভাবে প্রকাশ করেন নি। খাওয়ারিজমীর প্রকাশ ভংগি শাব্দিক, এমন কি সংখ্যাগুলো পর্যন্ত শব্দে লেখা - "বিয়াল্লিশ" বা "চল্লিশ" এভাবে। ইকুয়েশনকে শাব্দিকভাবে প্রকাশের জন্য তিনি যেসব টার্ম বেছে নেন, তা হল "স্কয়ার" (x**2), "রুট" (x) ও "সংখ্যা" (৪২)। তার দেয়া ছয়টি মূল ইকুয়েশনকে আজকের এলজাব্রায় প্রচলিত সিম্বলের মাধ্যমে নিম্নোক্ত উপায়ে লেখা যায়:
স্কয়ার যখন রুটের সমান: ax**2 = bx
স্কয়ার যখন সংখ্যার সমান: ax**2 = c
রুট যখন সংখ্যার সমান: bx = c
স্কয়ার এবং রুট যখন সংখ্যার সমান: ax**2 + bx = c
স্কয়ার এবং সংখ্যা যখন রুটের সমান: ax**2 + c = bx
রুট ও সংখ্যা যখন স্কয়ারের সমান: bx + c = ax**2
যে কোন ইকুয়েশনকে সরলীকরন করার পর এই ছয়টির একটিতে তিনি ফেলেন। তারপর বিভিন্ন জিওমেট্রিক ও এলজাব্রিক উপায়ে ইকুয়েশনের সমাধানে পৌছেন।
আল খাওয়ারিজমীর উদাহরন দেন: x**2 = 40x − 4x**2 কে পরিবর্তন করা যায় 5x**2 = 40x. এই অপারেশনটির পুন: পুন: প্রয়োগ দ্বারা ইকুয়েশন থেকে নেগেটিভ টার্মকে বিদায় করে দেয়া যায়। অন্যদিকে "আল মুকাবালা" বা "ব্যালেন্স" অপারেশন হচ্ছে ইকুয়েশনের দুই পাশ থেকে একই রাশি বিয়োগ দেয়া। যার ফলে, x**2 + 5 = 40x + 4x**2 হয়ে যায় is 5 = 40x + 3x**2। এরকম পুন পুন অপারেশনের মাধ্যমে স্কয়ার, রুট কিংবা সংখ্যা একটি ইকুয়েশনে মাত্র একবার করে আসে। ফলে উপরে উল্লিখিত ছয়টি সমাধান যোগ্য সমীকরনের একটিতে ফেলা সম্ভব হয়ে থাকে।
এই বইয়ের পরবর্তী অংশে কিছু বাস্তব উদাহরনের সমাধান দেয়া হয়েছে উপরের নিয়ম নীতিকে অনুসরন করে। এছাড়া ক্ষেত্র ও আয়তনের কিছু সমস্যার সমাধান রয়েছে। শেষ অংশে রয়েছে মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের কিছু উদাহরন ও তা সম্পর্কিত বাস্তব সমস্যার সমাধান।
খাওয়ারিজমীর প্রসংগে বিভিন্ন স্কলারদের মূল্যায়ন:
জে ও কনর এবং রবার্টসন ম্যাক টিউটর হিস্টরী অব ম্যাথমেটিক্স এর আর্কাইভে লেখেন:
"আল খাওয়ারিজমীর নূতন আইডিয়া গ্রীক গনিতের থেকে এক বৈপ্লবিক উত্তরন, কারন গ্রীক গনিত শাস্ত্র মূলত জিওমেট্রি বেসড। ......এলজাব্রা গনিত শাস্ত্রকে একটি নূতন উন্নত পথ দেখিয়েছে যা কনসেপ্টের দিক দিয়ে অতীতের চেয়ে অনেক বিস্তৃত, এবং যা ভবিষ্যৎ উন্নয়নের কারিগড়। "
ফিলিপ হাইটির ভাষ্য:
"তিনি অন্য যে কোন মধ্য যুগীয় লেখকের চেয়ে গনিতের চিন্তাধারার উপর অনেক বেশী অবদান রাখেন।"
ইতিহাসবেত্তা জর্জ সারটুন নবম শতকের প্রথম অর্ধেককে নির্দিষ্ট করে দেন খাওয়ারিজমীর জন্যে।
একজন বিশ্বাসী হিসেবে খাওয়ারিজমী:
তিনি তার অবদানের জন্য খলিফা মামুনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে লিখেছিলেন:
"আমিরুল মুমিনিন আল মামুনকে আল্লাহ বিজ্ঞানের প্রতি আসক্তি উপহার দিয়ে ধন্য করেছেন। যে বন্ধুত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা তিনি জ্ঞানীদের প্রতি প্রদর্শন করেন, যে দ্রুততার সাথে তিনি কাঠিন্যকে সহজ করতে এবং দুর্বোধ্যকে বোধগম্য করতে সাহায্য করে থাকেন - তাই আমাকে আল জবর ও আল মুকাবালা রচনা করতে অনুপ্রানিত করেছে, যা কি না সংখ্যা শাস্ত্রের জন্য সবচেয়ে সহজ এবং দরকারী। "
- আল খাওয়ারিজমী।
(That fondness for science, by which God has distinguished the IMAN AL MAMUN, the commander of the faithful, that affability and condescension which God shows to the learned, that promptitude with which he protects and supports them in the elucidation of obscurities and in the removal of difficulties, has encouraged me to compose a short work on calculating by al-Jabr [algebra] and al-Muqabala, confining it to what is easiest and most useful in arithmetic).
একজন একনিষ্ঠ মুসলিমের মতই আল খাওয়ারিজমীও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তার অবদানকে স্রষ্টার উপহার বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। খাওয়ারিজমীর বইয়ের মুখবন্ধ শুরু হয়েছে লেখকের পরিচয় ও বৃত্তান্ত দিয়ে -
মোহাম্মদ বিন মুসা, রাদি আল্লাহু আনহু ওয়া আথাবাহু ওয়া রাহেমা, অর্থ্যাৎ আল্লাহ মোহাম্মদ বিন মুসার উপর সন্তুষ্ট থাকুন এবং রহম করুন।
তিনি তার অবদানের জন্য আল্লাহর যেভাবে সন্তুষ্টি কামনা করেছেন, আমরাও উনার জন্য অনুরূপ প্রার্থনা করছি। আল্লাহ যেন তার আত্মার মাগফেরাত দেন এবং তাকে জান্নাতে দাখিল করেন।
===========================================
রেফারেন্স সাইট:
http://en.wikipedia.org/wiki/The_Compen … _Balancing
http://en.wikipedia.org/wiki/Muhammad_i … -Khwārizmī
http://knowledgerush.com/kr/encyclopedia/Al-Khawarizmi/
http://www.iidl.net/pdf/science/53359697.pdf
http://www.math10.com/en/maths-history/ … ardo2.html
http://www.muslimheritage.com/topics/de … icleID=317
http://books.google.com/books?id=8uEFaP … mp;f=false
পুনশ্চ: লেখাটির জন্য রেফারেন্স হিসেবে সবচেয়ে ডিটেইল বইটি হল: "গ্রেট মুনলিম ম্যাথমেটিশিয়ানস"। লিখেছেন "মোহাইনি মোহামেদ"। তিনি মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির এসোসিয়েট অধ্যাপিকা। http://books.google.com/books?id=8uEFaP … mp;f=false
যারা মালয়েশিয়া থাকেন, তারা কি উনার নাম শুনেছেন?
Last edited by ummu (গতকাল 22:01:40)
Friday, August 7, 2009
চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী ইবনে সিনা
স্বল্প কথায় পরিচিতি:
পশ্চিমে তিনি "দ্য প্রিন্স অব ফিজিশিয়ানস" নামে পরিচিত। তার গ্রন্থ "আল কানুন ফিল থিব" (কানুন অব মেডিসিন) চিকিৎসা শাস্ত্রের মূল অপ্রতিদ্বন্দ্বী পাঠ্য পুস্তক হিসেবে গন্য হত প্রায় পাচ শতক ধরে । যদিও তিনি ফার্মাকোলজি ও ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসের প্রভূত উন্নয়ন করেন, তার মূল অবদান ছিল মেডিসিন শাস্ত্রে। তিনি হলিস্টিক মেডিসিনের প্রনেতা - যেখানে একই সংগে শারীরীক, মানসিক, সামাজিক ও আত্মিক যোগসূত্রকে বিবেচনায় রেখে রুগীর চিকিৎসা করা হয়। তিনিই প্রথম মানব চক্ষুর সঠিক এনাটমি করেন। যক্ষা রোগ নিয়ে তিনি অভিমত দেন যে যক্ষা একটি ছোয়াচে রোগ। যা তার পরের পশ্চিমা চিকিৎসকবৃন্দ প্রত্যাখ্যান করেন এবং যা আরো পরে সঠিক বলে প্রমানিত হয়। তিনিই প্রথম মেনিনজাইটিসকে ব্যাখা করেন। প্রকৃত পক্ষে তিনিই আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক।
এই "তিনি" আর কেউ নন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী ইবনে সিনা। যার অসংখ্য অবদানের গুটি কয়েক অবদানের কথা উপরের প্যারাতে আমি উল্লেখ করেছি। যার জীবন কিংবা কর্মের কোন শেষ নেই, তার সমস্ত অবদান উল্লেখ করার অসম্ভব কোন ইচ্ছেও আমার নেই। তার শুভাকাংখীরা তাকে জ্ঞানার্জন ও গবেষনার প্রানান্ত পরিশ্রম ত্যাগ করে জীবনকে সহজ ভাবে নেবার উপদেশ দিতেন, যা তিনি হেলায় প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বলা হয়, তার মাইল স্টোন পুস্তক "কানুন" লিওনার্ডো দ্য ভিনসিকেও প্রভাবিত করেছিল। "কানুন" বারশ শতকে ল্যাটিন ভাষায় অনুদিত হয়ে প্রায় সতেরশ শতক পর্যন্ত পৃথিবীতে চিকিৎসা শাস্ত্রের টেক্স্ট বুক হিসেবে গন্য হত। একজন প্রথিতযশা পশ্চিমা ডক্টর "কানুন"কে "মেডিকেল বাইবেল" বলে ঘোষনা করেন। বুখারায় তার জন্ম স্থানে যে মিউজিয়াম রয়েছে তাতে তার নিবন্ধ, সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট এবং রুগীদের চিকিৎসারত অবস্থায় ছবি - এই সবই স্থান পেয়েছে। তিনি যে শুধু চিকিৎসা শাস্ত্রেই অবদান রেখেছেন তা নয়, বরং এস্ট্রোনমি সহ আরো অনেক শাখায় তার গুরুত্ব বহ অবদান রয়েছে। তিনি মোমেন্টামকে ওজন ও বেগের গুনফলের সমানুপাতিক বলে অভিমত দেন। তিনি আরো অভিমত দেন যে, হাজারো চেষ্টা করলেও সীসা বা তামা থেকে সোনা বানানো যাবে না, যা তার সময়ের অনেক বিজ্ঞানী নিরন্তর চেষ্টা করেছিলেন। তিনি শুক্র গ্রহকে পৃথিবীর চেয়ে সূর্যের অধিকতর নিকটে অবস্থিত বলে নির্নয় করেন। তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ চাদের একটি ফাটলের নাম তার নামে করা হয়েছে।
জীবদ্দশাতেই একজন সফল চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ইবনে সিনা জার্জানের রাজপুত্রের চিকিৎসা করে সুনাম কুড়িয়েছিলেন। এই জার্জানেই তিনি তার বিখ্যাত বই "কানুন" রচনা করেন। জার্জানের রাজপুত্র অনেক দিন ধরে অসুস্থতায় ছিলেন শয্যাশায়ী। স্থানীয় চিকিৎসকরা কিছুতেই তার অসুস্থতা ধরতে পারছিলেন না, তারা রীতিমত হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। অবশেষে ইবনে সিনার সাহায্য নেন। ইবনে সিনা খেয়াল করলেন রাজপুত্রের সামনে তার প্রেমিকার নাম উচ্চারন করতে পালসের গতি বেড়ে যায়। ইবনে সিনা সহজ ছোট্ট সমাধান দিলেন, "যুগলদের মিলিয়ে দাও।"
মেটাফিজিক্সের প্রতি তার গুরুত্ব যেভাবে এল:
প্রথমে ইবনে সিনা মেটাফিজিক্সকে স্পর্শের বাইরে বলে গুরুত্ব দেন নি। এর অধ্যয়নকে সময় নষ্ট বলে মনে করতেন। কিন্তু একটি বিকেল তাকে বদলে দিল। সে বিকেলে বইয়ের বাজারে এক বিক্রেতা তাকে অনেক কষ্টে তিন দিরহামের বিনিময়ে আরেকজন বিতর্কিত মুসলিম দার্শনিক ফারাবীর "অন দ্য অবজেক্টস অব মেটা ফিজিক্স" বইটিকে কিনতে প্ররোচিত করেন। বিক্রেতা খুব অর্থের দরকার হয়ে পড়েছিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি বইটি কেনেন। বইটি পড়ার পরে সবকিছু বদলে যায়। ফেলে আসা এরিস্টটলের মেটা ফিজিক্স দর্শনকে আবার গুরুত্ববহ মনে করেন এবং পরদিন এই কৃতজ্ঞতায় গরীবদের অর্থদান করেন। তিনি বলেন, "আমি এরিস্টটলের মেটা ফিজিক্স মোট চল্লিশ বার অধ্যয়ন করে তাকে হৃদয়ে আয়ত্ত্ব করি। তা সত্ত্বেও আমার বোঝায় ঘাটতি থেকে যায়। শেষে ফারাবীর এই বই পড়েই আমি এরিস্টটলের মেটা ফিজিক্স বুঝতে পারি।" তার দর্শনে মেটা ফিজিক্স একটি গুরুত্বপূর্ন স্থান দখল করে রয়েছে। তার অন্যতম মাইলস্টোন পুস্তক শিফাকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়: লজিক, ফিজিক্স, মেটা ফিজিক্স, ম্যাথমেটিক্স। এই মেটা ফিজিক্সের উপরে গবেষনা পরবর্তীতে তার বিরোধীদের প্রধান অস্ত্রে পরিনত হয়।
যেভাবে এল কাফের ফতোয়া:
মাত্র দশ বছর বয়েসে অসাধারন মেধাবী ইবনে সিনা হাফিজ হন। আর সতের বছর বয়েসে হন চিকিৎসক। ইবনে নিসা, ল্যাটিন ভাষায় যাকে বলা হয় "আভিসেনা", অভিযুক্ত হন মুরতাদ এবং কাফের হিসেবে। তার বিরুদ্ধে এই ফতোয়া ইস্যু করেন ইমাম গাজ্জালী।
কিন্তু কেন? ইবনে নিসাই তো প্রথম তার দর্শনে আল্লাহর অস্তিত্বকে প্রমান করার প্রয়াস নেন যা রয়েছে "শিফা"র মেটা ফিজিক্স অধ্যায়ে। তিনি এরিস্টটলের অস্তিত্ব ও করন মতবাদকে ব্যাখা করতে গিয়ে বলেন, কাজ এবং ফলাফল একই সাথে অবস্থান করে। তিনি প্রকৃতির সব কিছুকে একটি চেইনের মাধ্যমে প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, "এই চেইন অসীম হতে পারেনা, অবশ্যই সসীম যার প্রথমে রয়েছেন স্রষ্টা যিনি পরমূখাপেক্ষী নন। যা এই চেইনের একমাত্র ব্যতিক্রম।"
ইবনে সিনার প্রতি ইমাম গাজ্জালীর এই বিরোধীতার মূলে রয়েছে মেটা ফিজিক্সে ইবনে সিনার নিজস্ব দর্শন। তার বিরুদ্ধে কাফের ফতোয়া দেয়া হয় নিম্নোক্ত তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। প্রথমত: ইবনে সিনা তার দর্শনে বিশ্বকে চিরজীবী দাবী করেন যার কোন শুরু নেই। যেখানে মুসলিমরা বিশ্বাস করেন আল্লাহ শূন্য থেকে এই পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন। দ্বিতীয়ত: তিনি বলেন, আল্লাহ সৃষ্টি এবং ধ্বংস সম্পর্কে সাধারন ভাবে জানেন, কিন্তু পুংখানুপুঙ্খ ভাবে নয়। যেখানে মুসলিমরা বিশ্বাস করে থাকেন, আল্লাহ আক্ষরিক অর্থেই প্রতিটি বিষয় অবগত। তৃতীয়ত, তিনি শারীরীক পুনরুথ্থান নয়, বরং আত্মিক পুনরুথ্থানের উপর জোড় দেন। মূলত এই তিনটি কারনে ইমাম গাজালী ইবনে সিনাকে কাফের সাব্যস্ত করা বাধ্যতামূলক বলে দাবী করেন।
এখন দেখা যাক, এই আপাত বিতর্কিত্ ইস্যু গুলো নিয়ে ইবনে সিনা আসলে কি বলেছিলেন।
ইবনে সিনা এটা বিশ্বাস করতেন যে, এই বিশ্ব চিরজীবী বা আদি অন্ত বিহীন। তবে এটাও বিশ্বাস করতেন যে, বিশ্ব একটি সৃষ্ট বস্তু। তিনি ব্যাখা দেন, সৃষ্ট হবার অর্থ এই নয় যে সময়ের প্রেক্ষিতে তার কোন শুরু আছে। তিনি আরো বলেন, বিশ্বের অস্তিত্বের পেছনে কার্যকরন ও প্রয়োজন বিদ্যমান। আল্লাহ এই বিশ্বকে হতে দিয়েছেন, যার শুরু থাকতেও পারে কিংবা নাও থাকতে পারে। তবে শেষ নেই। ইমাম গাজালী চ্যালেন্জ্ঞ দিয়ে বলেন, আল্লাহ যদি একমাত্র স্বাধীন অমূখাপেক্ষী সত্ত্বা হন তবে বিশ্বকে তার পরেই সৃষ্ট হতে হবে, তা অস্তিত্ব ও সময় - দুটোরই মানদন্ডে। সুতরাং তা অনাদি অনন্ত হতে পারে না। এই দর্শনকে কুফরী বলে আখ্যায়িত করেছেন ইমাম গাজালী।
এবারে আসা যাক আল্লাহর জ্ঞানের পরিধি নিয়ে ইবনে সিনা কি বলেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহ সমস্ত খুটিনাটি বিষয় সম্পর্কে অবহিত, তবে এই জানাটা সামগ্রিক। সময়ের ভিত্তিতে তার জ্ঞানের কোন পরিবর্তন হয় না। ফলে যখন কোন ইভেন্ট সত্যি সত্যি সংঘটিত হয়, তখন তা তিনি নূতন করে জানতে পারেন না, কারন তার জ্ঞান সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয় না। ইবনে সিনা আল্লাহর "একচ্ছত্র (এবসোলিউট) জ্ঞান"কে "সময়ের সাথে অপরিবর্তনশীল" বলে ব্যাখা করেন।
("When this particular event actually occurs in time, God, not being subject to temporal change, cannot know it. But He also need not know it in this manner for He knows it already".) ইবনে সিনার স্রষ্টা সম্পর্কিত দর্শন সাদামাটা ভাষায় (আমি যা বুঝলাম) হচ্ছে : প্রকৃতির প্রতিটি নিয়ম স্রষ্টার অবগত এবং প্রকৃতির প্রতিটি বস্তু কার্যকরন, ফলাফল ও তাদের সম্পর্কের দ্বারা পরিচালিত। যেহেতু এসব বস্তু নিয়মের বাইরে নয়, এবং সেই নিয়মের খুটিনাটি স্রষ্টার অবগত, তাই এসব বস্তুর খুটিনাটি সম্পর্কে স্রষ্টার ধারনা সামগ্রিক।
সত্যি বলতে কি তার এই ডকট্রিনে আমি কোন কুফরি খুজে পাই নি। যদিও এই ডকট্রিনকেও কুফরী লেবেল সাটা হয়েছে। ইবনে সিনা "স্রষ্টার খুটিনাটি জ্ঞান" কে ব্যাখা করেছেন তার নিজের দর্শন দিয়ে। এই খুটিনাটি জ্ঞানকে তিনি অস্বীকার করেন নি মোটেও। তিনি যুক্তি এবং কার্যকরনকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, সমস্ত ঘটনা প্রবাহ নিয়মের ছকে বাধা বলেই ঘটছে। এই নিয়ম স্রষ্টার তৈরী যার ফলে কোন ঘটনা ঘটলে তা আলাদা ভাবে স্রষ্টার জানার কিছু নেই কারন তা তো নিয়মের প্রেক্ষিতেই ঘটেছে। সেন্স-পারসেপশন, যা ঘটনাপ্রবাহের উপর নির্ভর করে, তা স্রষ্টার ক্ষেত্রে খাটেনা কারন তার জ্ঞান সময়ের উর্ধ্বে এবং সময়ের সাথে অপরিবর্তনশীল। আমি যা বুঝলাম তা হল পুরো বিশ্ব এবং তার ঘটনাপ্রবাহকে একটি if-else সমৃদ্ধ প্রোগ্রাম দিয়ে প্রকাশ করা যায়, যার ইনপুট আউটপুট সহ পুরো প্রোগ্রাম স্রষ্টার জ্ঞানের সীমায়। তাই খুটিনাটি ভাবে কখন কোন পথ ধরে প্রোগ্রাম এগুচ্ছে তা তো স্রষ্টার জানার কোন প্রয়োজন নেই। যা হোক, এই ডকট্রিন তার বিরুদ্ধে ফতোয়ার ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তাকে সবচাইতে বেশী সমালোচনা সহ্য করতে হয় যে কারনে তা হল শারীরীক পুনরুথ্থান বিষয়ে তার অবস্থান। দাবী করা হয় মৃত্যু পরবর্তী শারীরীক পুনরুথ্থানকে ইবনে সিনা অস্বীকার করেছেন। উল্লেখ্য শারীরীক পুনরুথ্থানে বিশ্বাস পোষন ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের একটি। নীচের আয়াতগুলোতে সমর্থন পাওয়া যাবে:
"মানুষ কি মনে করে যে আমরা কখনো তার হাড়গোড় একত্রিত করব না। হ্যা, আমরা তার আংগুলগুলো পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম।" (ক্কিয়ামাহ: ৩-৪)।
"তারা বলেঃ যখন আমরা অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাব, তখনও কি নতুন করে সৃজিত হয়ে উত্থিত হব? বলুনঃ তোমরা পাথর হয়ে যাও কিংবা লোহা। অথবা এমন কোন বস্তু, যা তোমাদের ধারণায় খুবই কঠিন; তথাপি তারা বলবেঃ আমাদের কে পুর্নবার কে সৃষ্টি করবে। বলুনঃ যিনি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃজন করেছেন। অতঃপর তারা আপনার সামনে মাথা নাড়বে এবং বলবেঃ এটা কবে হবে? বলুনঃ হবে, সম্ভবতঃ শ্রীঘ্রই।" [বনী ইসরাঈল/ইসরাঃ ৪৯-৫১]
শারীরীক পুনরুথ্থানকে অস্বীকার করার জন্য ইমাম গাজ্জালী ও আরো অনেক স্কলার ইবনে সিনাকে কাফের সাব্যস্ত করা বাধ্যতামূলক বলে দাবী করেছিলেন। মূলত এই মতবাদের ভিত্তিতে ইবনে সিনার উপর কুফরী আরোপ করা হয়। এখন প্রশ্ন ইবনে সিনা কি সত্যিই শারীরীক পুনরুথ্থানকে অস্বীকার করেছিলেন? উল্লেখ্য ইবনে সিনা নিজেও বলেছেন মৃত্যু পরবর্তী জীবনকে ইসলামের আলোতেই ব্যাখা করতে হবে, এছাড়া আর কোন যুক্তি গ্রাহ্য ব্যাখা নেই। ইবনে সিনা আত্মিক পুনরুথ্থানের পক্ষে নীচের আয়াতগুলো দেন:
"হে প্রশান্ত মন।
তুমি তোমার পালন কর্তার দিকে ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে।"
(ফজর : ২৭-২৮)
ফেরেশতা ও রূহ আল্লাহর দিকে ঊর্ধ্বগামী হয় (মাআরিজ : ৪)
পরবর্তী কালে যখন ইবনে সিনার দর্শনকে আরো বিশ্লেষন করা হয়, তখন দেখা যায় তিনি প্রকৃত পক্ষে শারীরীক পুনরুথ্থানকে পুরো অস্বীকার করেন নি। তিনি সুরা ওয়াকিয়াতে যে তিনটি দলের কথা বলা হয়েছে (আর তোমরা হয়ে পড়বে তিনটি শ্রেনীতে (ওয়াক্কিয়াহ : ৭)), তার তৃতীয় দলটিকে শুধু মাত্র শারীরীক পুনরুথ্থান করা হবে বলে দাবী করেছেন। বাকী দুই দল আত্মিক ভাবেই স্বর্গ লাভ করবে। তৃতীয় দলের শারীরীক পুনরুথ্থান হবে শাস্তির জন্য। সুতরাং ইবনে সিনা শারীরীক পুনরুথ্থানকে একটি বিশেষ দলের জন্য নির্ধারন করেছেন। যার ফলে ইবনে সিনা শারীরীক পুনরুথ্থানকে সম্পূর্ন অস্বীকার করেছেন - বিরোধীদের এই দাবী দুর্বল হয়ে যায়।
এখানে উল্লেখ্য ইসলামের ইতিহাসে যুক্তি এবং লজিককে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়ার সিলসিলা ইবনে সিনাই যে প্রথম শুরু করেন - তা নয়। তার আগে মুতাজিলা গোষ্ঠীও যুক্তিকে আশ্রয় করে ইসলামের অনেক বিভ্রান্তিকর ব্যাখা দেয়। অথচ তাদের প্রতি কেউ কাফের ফতোয়া ইস্যু করে নি। আমার স্মৃতি বিশ্বাসঘাতকতা না করে থাকলে হাদীসকে শরিয়ার উৎস হিসেবে প্রথম অস্বীকার করে এই মুতাজিলা গোষ্ঠী। কারন তারা যুক্তি দিয়ে ইসলামের অনেক মৌলিক আকিদা ব্যাখা করতে চাইত, যা অনেক সময় হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক হত। ইবনে সিনার দর্শনেও এই মুতাজিলা গোষ্ঠীর প্রভাব কিছুটা দেখা যায়।
ইবনে সিনা আত্মবিশ্বাসী একজন মানুষ ছিলেন। তিনি নিজেকে জ্ঞানী, বুদ্ধিমান ও একনিষ্ঠ মুসলিম বলে দাবী করতেন। তার প্রথম দুইটি দাবীর সাথে বিশ্ব একমত, যদিও তৃতীয় দাবীটি সর্বজন স্বীকৃত হয় নি। তবে পরবর্তীতে অনেকেই দাবী করেছেন কাফের ফতোয়াটা ইবনে সিনার জন্য ছিল অতিরিক্ত কঠোর একটি ফতোয়া।
কাফের ফতোয়াকে অস্বীকার করে ইবনে সিনার কবিতাটা তুলে দিলাম:
"আমার মত কাউকে ব্লাসফেমীর দায়ে অভিযুক্ত করা সহজ কিংবা সহজলভ্য নয়
আমার চেয়ে দৃঢ় বিশ্বাস আর নেই
আমার মত কেউ যদি অধার্মিক হয়ে থাকে
তবে পৃথিবীতে আর কোন মুসলিম নেই।"
পশ্চিমে তিনি "দ্য প্রিন্স অব ফিজিশিয়ানস" নামে পরিচিত। তার গ্রন্থ "আল কানুন ফিল থিব" (কানুন অব মেডিসিন) চিকিৎসা শাস্ত্রের মূল অপ্রতিদ্বন্দ্বী পাঠ্য পুস্তক হিসেবে গন্য হত প্রায় পাচ শতক ধরে । যদিও তিনি ফার্মাকোলজি ও ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসের প্রভূত উন্নয়ন করেন, তার মূল অবদান ছিল মেডিসিন শাস্ত্রে। তিনি হলিস্টিক মেডিসিনের প্রনেতা - যেখানে একই সংগে শারীরীক, মানসিক, সামাজিক ও আত্মিক যোগসূত্রকে বিবেচনায় রেখে রুগীর চিকিৎসা করা হয়। তিনিই প্রথম মানব চক্ষুর সঠিক এনাটমি করেন। যক্ষা রোগ নিয়ে তিনি অভিমত দেন যে যক্ষা একটি ছোয়াচে রোগ। যা তার পরের পশ্চিমা চিকিৎসকবৃন্দ প্রত্যাখ্যান করেন এবং যা আরো পরে সঠিক বলে প্রমানিত হয়। তিনিই প্রথম মেনিনজাইটিসকে ব্যাখা করেন। প্রকৃত পক্ষে তিনিই আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের জনক।
এই "তিনি" আর কেউ নন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী ইবনে সিনা। যার অসংখ্য অবদানের গুটি কয়েক অবদানের কথা উপরের প্যারাতে আমি উল্লেখ করেছি। যার জীবন কিংবা কর্মের কোন শেষ নেই, তার সমস্ত অবদান উল্লেখ করার অসম্ভব কোন ইচ্ছেও আমার নেই। তার শুভাকাংখীরা তাকে জ্ঞানার্জন ও গবেষনার প্রানান্ত পরিশ্রম ত্যাগ করে জীবনকে সহজ ভাবে নেবার উপদেশ দিতেন, যা তিনি হেলায় প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বলা হয়, তার মাইল স্টোন পুস্তক "কানুন" লিওনার্ডো দ্য ভিনসিকেও প্রভাবিত করেছিল। "কানুন" বারশ শতকে ল্যাটিন ভাষায় অনুদিত হয়ে প্রায় সতেরশ শতক পর্যন্ত পৃথিবীতে চিকিৎসা শাস্ত্রের টেক্স্ট বুক হিসেবে গন্য হত। একজন প্রথিতযশা পশ্চিমা ডক্টর "কানুন"কে "মেডিকেল বাইবেল" বলে ঘোষনা করেন। বুখারায় তার জন্ম স্থানে যে মিউজিয়াম রয়েছে তাতে তার নিবন্ধ, সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট এবং রুগীদের চিকিৎসারত অবস্থায় ছবি - এই সবই স্থান পেয়েছে। তিনি যে শুধু চিকিৎসা শাস্ত্রেই অবদান রেখেছেন তা নয়, বরং এস্ট্রোনমি সহ আরো অনেক শাখায় তার গুরুত্ব বহ অবদান রয়েছে। তিনি মোমেন্টামকে ওজন ও বেগের গুনফলের সমানুপাতিক বলে অভিমত দেন। তিনি আরো অভিমত দেন যে, হাজারো চেষ্টা করলেও সীসা বা তামা থেকে সোনা বানানো যাবে না, যা তার সময়ের অনেক বিজ্ঞানী নিরন্তর চেষ্টা করেছিলেন। তিনি শুক্র গ্রহকে পৃথিবীর চেয়ে সূর্যের অধিকতর নিকটে অবস্থিত বলে নির্নয় করেন। তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ চাদের একটি ফাটলের নাম তার নামে করা হয়েছে।
জীবদ্দশাতেই একজন সফল চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ইবনে সিনা জার্জানের রাজপুত্রের চিকিৎসা করে সুনাম কুড়িয়েছিলেন। এই জার্জানেই তিনি তার বিখ্যাত বই "কানুন" রচনা করেন। জার্জানের রাজপুত্র অনেক দিন ধরে অসুস্থতায় ছিলেন শয্যাশায়ী। স্থানীয় চিকিৎসকরা কিছুতেই তার অসুস্থতা ধরতে পারছিলেন না, তারা রীতিমত হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। অবশেষে ইবনে সিনার সাহায্য নেন। ইবনে সিনা খেয়াল করলেন রাজপুত্রের সামনে তার প্রেমিকার নাম উচ্চারন করতে পালসের গতি বেড়ে যায়। ইবনে সিনা সহজ ছোট্ট সমাধান দিলেন, "যুগলদের মিলিয়ে দাও।"
মেটাফিজিক্সের প্রতি তার গুরুত্ব যেভাবে এল:
প্রথমে ইবনে সিনা মেটাফিজিক্সকে স্পর্শের বাইরে বলে গুরুত্ব দেন নি। এর অধ্যয়নকে সময় নষ্ট বলে মনে করতেন। কিন্তু একটি বিকেল তাকে বদলে দিল। সে বিকেলে বইয়ের বাজারে এক বিক্রেতা তাকে অনেক কষ্টে তিন দিরহামের বিনিময়ে আরেকজন বিতর্কিত মুসলিম দার্শনিক ফারাবীর "অন দ্য অবজেক্টস অব মেটা ফিজিক্স" বইটিকে কিনতে প্ররোচিত করেন। বিক্রেতা খুব অর্থের দরকার হয়ে পড়েছিল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি বইটি কেনেন। বইটি পড়ার পরে সবকিছু বদলে যায়। ফেলে আসা এরিস্টটলের মেটা ফিজিক্স দর্শনকে আবার গুরুত্ববহ মনে করেন এবং পরদিন এই কৃতজ্ঞতায় গরীবদের অর্থদান করেন। তিনি বলেন, "আমি এরিস্টটলের মেটা ফিজিক্স মোট চল্লিশ বার অধ্যয়ন করে তাকে হৃদয়ে আয়ত্ত্ব করি। তা সত্ত্বেও আমার বোঝায় ঘাটতি থেকে যায়। শেষে ফারাবীর এই বই পড়েই আমি এরিস্টটলের মেটা ফিজিক্স বুঝতে পারি।" তার দর্শনে মেটা ফিজিক্স একটি গুরুত্বপূর্ন স্থান দখল করে রয়েছে। তার অন্যতম মাইলস্টোন পুস্তক শিফাকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়: লজিক, ফিজিক্স, মেটা ফিজিক্স, ম্যাথমেটিক্স। এই মেটা ফিজিক্সের উপরে গবেষনা পরবর্তীতে তার বিরোধীদের প্রধান অস্ত্রে পরিনত হয়।
যেভাবে এল কাফের ফতোয়া:
মাত্র দশ বছর বয়েসে অসাধারন মেধাবী ইবনে সিনা হাফিজ হন। আর সতের বছর বয়েসে হন চিকিৎসক। ইবনে নিসা, ল্যাটিন ভাষায় যাকে বলা হয় "আভিসেনা", অভিযুক্ত হন মুরতাদ এবং কাফের হিসেবে। তার বিরুদ্ধে এই ফতোয়া ইস্যু করেন ইমাম গাজ্জালী।
কিন্তু কেন? ইবনে নিসাই তো প্রথম তার দর্শনে আল্লাহর অস্তিত্বকে প্রমান করার প্রয়াস নেন যা রয়েছে "শিফা"র মেটা ফিজিক্স অধ্যায়ে। তিনি এরিস্টটলের অস্তিত্ব ও করন মতবাদকে ব্যাখা করতে গিয়ে বলেন, কাজ এবং ফলাফল একই সাথে অবস্থান করে। তিনি প্রকৃতির সব কিছুকে একটি চেইনের মাধ্যমে প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, "এই চেইন অসীম হতে পারেনা, অবশ্যই সসীম যার প্রথমে রয়েছেন স্রষ্টা যিনি পরমূখাপেক্ষী নন। যা এই চেইনের একমাত্র ব্যতিক্রম।"
ইবনে সিনার প্রতি ইমাম গাজ্জালীর এই বিরোধীতার মূলে রয়েছে মেটা ফিজিক্সে ইবনে সিনার নিজস্ব দর্শন। তার বিরুদ্ধে কাফের ফতোয়া দেয়া হয় নিম্নোক্ত তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। প্রথমত: ইবনে সিনা তার দর্শনে বিশ্বকে চিরজীবী দাবী করেন যার কোন শুরু নেই। যেখানে মুসলিমরা বিশ্বাস করেন আল্লাহ শূন্য থেকে এই পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন। দ্বিতীয়ত: তিনি বলেন, আল্লাহ সৃষ্টি এবং ধ্বংস সম্পর্কে সাধারন ভাবে জানেন, কিন্তু পুংখানুপুঙ্খ ভাবে নয়। যেখানে মুসলিমরা বিশ্বাস করে থাকেন, আল্লাহ আক্ষরিক অর্থেই প্রতিটি বিষয় অবগত। তৃতীয়ত, তিনি শারীরীক পুনরুথ্থান নয়, বরং আত্মিক পুনরুথ্থানের উপর জোড় দেন। মূলত এই তিনটি কারনে ইমাম গাজালী ইবনে সিনাকে কাফের সাব্যস্ত করা বাধ্যতামূলক বলে দাবী করেন।
এখন দেখা যাক, এই আপাত বিতর্কিত্ ইস্যু গুলো নিয়ে ইবনে সিনা আসলে কি বলেছিলেন।
ইবনে সিনা এটা বিশ্বাস করতেন যে, এই বিশ্ব চিরজীবী বা আদি অন্ত বিহীন। তবে এটাও বিশ্বাস করতেন যে, বিশ্ব একটি সৃষ্ট বস্তু। তিনি ব্যাখা দেন, সৃষ্ট হবার অর্থ এই নয় যে সময়ের প্রেক্ষিতে তার কোন শুরু আছে। তিনি আরো বলেন, বিশ্বের অস্তিত্বের পেছনে কার্যকরন ও প্রয়োজন বিদ্যমান। আল্লাহ এই বিশ্বকে হতে দিয়েছেন, যার শুরু থাকতেও পারে কিংবা নাও থাকতে পারে। তবে শেষ নেই। ইমাম গাজালী চ্যালেন্জ্ঞ দিয়ে বলেন, আল্লাহ যদি একমাত্র স্বাধীন অমূখাপেক্ষী সত্ত্বা হন তবে বিশ্বকে তার পরেই সৃষ্ট হতে হবে, তা অস্তিত্ব ও সময় - দুটোরই মানদন্ডে। সুতরাং তা অনাদি অনন্ত হতে পারে না। এই দর্শনকে কুফরী বলে আখ্যায়িত করেছেন ইমাম গাজালী।
এবারে আসা যাক আল্লাহর জ্ঞানের পরিধি নিয়ে ইবনে সিনা কি বলেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহ সমস্ত খুটিনাটি বিষয় সম্পর্কে অবহিত, তবে এই জানাটা সামগ্রিক। সময়ের ভিত্তিতে তার জ্ঞানের কোন পরিবর্তন হয় না। ফলে যখন কোন ইভেন্ট সত্যি সত্যি সংঘটিত হয়, তখন তা তিনি নূতন করে জানতে পারেন না, কারন তার জ্ঞান সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয় না। ইবনে সিনা আল্লাহর "একচ্ছত্র (এবসোলিউট) জ্ঞান"কে "সময়ের সাথে অপরিবর্তনশীল" বলে ব্যাখা করেন।
("When this particular event actually occurs in time, God, not being subject to temporal change, cannot know it. But He also need not know it in this manner for He knows it already".) ইবনে সিনার স্রষ্টা সম্পর্কিত দর্শন সাদামাটা ভাষায় (আমি যা বুঝলাম) হচ্ছে : প্রকৃতির প্রতিটি নিয়ম স্রষ্টার অবগত এবং প্রকৃতির প্রতিটি বস্তু কার্যকরন, ফলাফল ও তাদের সম্পর্কের দ্বারা পরিচালিত। যেহেতু এসব বস্তু নিয়মের বাইরে নয়, এবং সেই নিয়মের খুটিনাটি স্রষ্টার অবগত, তাই এসব বস্তুর খুটিনাটি সম্পর্কে স্রষ্টার ধারনা সামগ্রিক।
সত্যি বলতে কি তার এই ডকট্রিনে আমি কোন কুফরি খুজে পাই নি। যদিও এই ডকট্রিনকেও কুফরী লেবেল সাটা হয়েছে। ইবনে সিনা "স্রষ্টার খুটিনাটি জ্ঞান" কে ব্যাখা করেছেন তার নিজের দর্শন দিয়ে। এই খুটিনাটি জ্ঞানকে তিনি অস্বীকার করেন নি মোটেও। তিনি যুক্তি এবং কার্যকরনকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, সমস্ত ঘটনা প্রবাহ নিয়মের ছকে বাধা বলেই ঘটছে। এই নিয়ম স্রষ্টার তৈরী যার ফলে কোন ঘটনা ঘটলে তা আলাদা ভাবে স্রষ্টার জানার কিছু নেই কারন তা তো নিয়মের প্রেক্ষিতেই ঘটেছে। সেন্স-পারসেপশন, যা ঘটনাপ্রবাহের উপর নির্ভর করে, তা স্রষ্টার ক্ষেত্রে খাটেনা কারন তার জ্ঞান সময়ের উর্ধ্বে এবং সময়ের সাথে অপরিবর্তনশীল। আমি যা বুঝলাম তা হল পুরো বিশ্ব এবং তার ঘটনাপ্রবাহকে একটি if-else সমৃদ্ধ প্রোগ্রাম দিয়ে প্রকাশ করা যায়, যার ইনপুট আউটপুট সহ পুরো প্রোগ্রাম স্রষ্টার জ্ঞানের সীমায়। তাই খুটিনাটি ভাবে কখন কোন পথ ধরে প্রোগ্রাম এগুচ্ছে তা তো স্রষ্টার জানার কোন প্রয়োজন নেই। যা হোক, এই ডকট্রিন তার বিরুদ্ধে ফতোয়ার ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তাকে সবচাইতে বেশী সমালোচনা সহ্য করতে হয় যে কারনে তা হল শারীরীক পুনরুথ্থান বিষয়ে তার অবস্থান। দাবী করা হয় মৃত্যু পরবর্তী শারীরীক পুনরুথ্থানকে ইবনে সিনা অস্বীকার করেছেন। উল্লেখ্য শারীরীক পুনরুথ্থানে বিশ্বাস পোষন ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের একটি। নীচের আয়াতগুলোতে সমর্থন পাওয়া যাবে:
"মানুষ কি মনে করে যে আমরা কখনো তার হাড়গোড় একত্রিত করব না। হ্যা, আমরা তার আংগুলগুলো পর্যন্ত পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম।" (ক্কিয়ামাহ: ৩-৪)।
"তারা বলেঃ যখন আমরা অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাব, তখনও কি নতুন করে সৃজিত হয়ে উত্থিত হব? বলুনঃ তোমরা পাথর হয়ে যাও কিংবা লোহা। অথবা এমন কোন বস্তু, যা তোমাদের ধারণায় খুবই কঠিন; তথাপি তারা বলবেঃ আমাদের কে পুর্নবার কে সৃষ্টি করবে। বলুনঃ যিনি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃজন করেছেন। অতঃপর তারা আপনার সামনে মাথা নাড়বে এবং বলবেঃ এটা কবে হবে? বলুনঃ হবে, সম্ভবতঃ শ্রীঘ্রই।" [বনী ইসরাঈল/ইসরাঃ ৪৯-৫১]
শারীরীক পুনরুথ্থানকে অস্বীকার করার জন্য ইমাম গাজ্জালী ও আরো অনেক স্কলার ইবনে সিনাকে কাফের সাব্যস্ত করা বাধ্যতামূলক বলে দাবী করেছিলেন। মূলত এই মতবাদের ভিত্তিতে ইবনে সিনার উপর কুফরী আরোপ করা হয়। এখন প্রশ্ন ইবনে সিনা কি সত্যিই শারীরীক পুনরুথ্থানকে অস্বীকার করেছিলেন? উল্লেখ্য ইবনে সিনা নিজেও বলেছেন মৃত্যু পরবর্তী জীবনকে ইসলামের আলোতেই ব্যাখা করতে হবে, এছাড়া আর কোন যুক্তি গ্রাহ্য ব্যাখা নেই। ইবনে সিনা আত্মিক পুনরুথ্থানের পক্ষে নীচের আয়াতগুলো দেন:
"হে প্রশান্ত মন।
তুমি তোমার পালন কর্তার দিকে ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে।"
(ফজর : ২৭-২৮)
ফেরেশতা ও রূহ আল্লাহর দিকে ঊর্ধ্বগামী হয় (মাআরিজ : ৪)
পরবর্তী কালে যখন ইবনে সিনার দর্শনকে আরো বিশ্লেষন করা হয়, তখন দেখা যায় তিনি প্রকৃত পক্ষে শারীরীক পুনরুথ্থানকে পুরো অস্বীকার করেন নি। তিনি সুরা ওয়াকিয়াতে যে তিনটি দলের কথা বলা হয়েছে (আর তোমরা হয়ে পড়বে তিনটি শ্রেনীতে (ওয়াক্কিয়াহ : ৭)), তার তৃতীয় দলটিকে শুধু মাত্র শারীরীক পুনরুথ্থান করা হবে বলে দাবী করেছেন। বাকী দুই দল আত্মিক ভাবেই স্বর্গ লাভ করবে। তৃতীয় দলের শারীরীক পুনরুথ্থান হবে শাস্তির জন্য। সুতরাং ইবনে সিনা শারীরীক পুনরুথ্থানকে একটি বিশেষ দলের জন্য নির্ধারন করেছেন। যার ফলে ইবনে সিনা শারীরীক পুনরুথ্থানকে সম্পূর্ন অস্বীকার করেছেন - বিরোধীদের এই দাবী দুর্বল হয়ে যায়।
এখানে উল্লেখ্য ইসলামের ইতিহাসে যুক্তি এবং লজিককে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়ার সিলসিলা ইবনে সিনাই যে প্রথম শুরু করেন - তা নয়। তার আগে মুতাজিলা গোষ্ঠীও যুক্তিকে আশ্রয় করে ইসলামের অনেক বিভ্রান্তিকর ব্যাখা দেয়। অথচ তাদের প্রতি কেউ কাফের ফতোয়া ইস্যু করে নি। আমার স্মৃতি বিশ্বাসঘাতকতা না করে থাকলে হাদীসকে শরিয়ার উৎস হিসেবে প্রথম অস্বীকার করে এই মুতাজিলা গোষ্ঠী। কারন তারা যুক্তি দিয়ে ইসলামের অনেক মৌলিক আকিদা ব্যাখা করতে চাইত, যা অনেক সময় হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক হত। ইবনে সিনার দর্শনেও এই মুতাজিলা গোষ্ঠীর প্রভাব কিছুটা দেখা যায়।
ইবনে সিনা আত্মবিশ্বাসী একজন মানুষ ছিলেন। তিনি নিজেকে জ্ঞানী, বুদ্ধিমান ও একনিষ্ঠ মুসলিম বলে দাবী করতেন। তার প্রথম দুইটি দাবীর সাথে বিশ্ব একমত, যদিও তৃতীয় দাবীটি সর্বজন স্বীকৃত হয় নি। তবে পরবর্তীতে অনেকেই দাবী করেছেন কাফের ফতোয়াটা ইবনে সিনার জন্য ছিল অতিরিক্ত কঠোর একটি ফতোয়া।
কাফের ফতোয়াকে অস্বীকার করে ইবনে সিনার কবিতাটা তুলে দিলাম:
"আমার মত কাউকে ব্লাসফেমীর দায়ে অভিযুক্ত করা সহজ কিংবা সহজলভ্য নয়
আমার চেয়ে দৃঢ় বিশ্বাস আর নেই
আমার মত কেউ যদি অধার্মিক হয়ে থাকে
তবে পৃথিবীতে আর কোন মুসলিম নেই।"
Wednesday, February 11, 2009
একটি কৈফিয়ত
প্রিয় তুমি,
আমার এ চিঠি কোনদিন তুমি পড়বে, এ অসম্ভব ভাবনা কখনই আমার মনে খেলে যায় নি। কি করেই বা পড়বে, তুমি তো এখন আর এ ভূবনের কেউ নও। এ জগতের মেয়াদ শেষ করে অনেক আগেই অন্য ভূবনে নিজের বাস গড়েছ। বড় অসময়ে চলে গেছ, তবে ফেলে গিয়েছ একরাশ স্মৃতি! আমাদের ছেড়ে বিদায় নেবার সে যাওয়াটা যেন সম্পূর্ন নয় - রেখে গিয়েছ ছায়া তোমার বংশধরদের মাঝে। দৃঢ়ভাবে নিজের আসন গেড়ে নিয়েছ এই পৃথিবীতে। বহুদূরে চলে গেছ, তবু বার বার আমরা তোমার অপার্থিব কোলাহল অনুভব করি, চারিপাশে শুনতে পাই তোমার অব্যক্ত ধ্বনি - আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেব না ভুলিতে।
তোমার কাছে আমি হয়ত বা মূল্যহীন, অপাংক্তেয়। আমার কথা শোনার কোন ফুসরত তোমার কখনই ছিল না। কিংবা কখনও যদি আমার কোন কথা দুদন্ডের জন্য শুনেও থেকেছ, তবুও তা তোমার কাছে ছিল একেবারেই গুরুত্ব হীন, আবার কখনও বা উপহাসের বিষয় বস্তু। থাক না হয় সেসব কথা এখন। তবে জানবে, এত অবহেলা সত্ত্বেও আমার কাছে তুমি কোন অংশে গুরুত্বহীন নও। প্রবাসের দুর্লভ অবসরের হাজারো স্মৃতি চারনে হাজার মুখের যে মুখটি আমাকে সবচেয়ে বেশী নাড়া দিয়ে যায়, তা তোমার মুখ। প্লে ব্যাক হয়ে ভাসতে থাকে তোমার আনন্দ, অভিমান, উচ্ছাস কিংবা প্রিয় মানুষটির জন্য অপেক্ষার আকুলতা। এ পৃথিবীতে কাটিয়ে যাওয়া তোমার দিনলিপিতে প্রতিটি প্রত্যক্ষকৃত ক্ষন আমার স্মৃতিতে অম্লান। অথচ, তোমাকে তো আমি সবসময়ই ভুলতে চেয়েছি। আমার অনুভূতি থেকে বার বার সরিয়ে দিতে চেয়েছি তোমাকে, তোমার সমস্ত চিহ্নকে। সে চেষ্টার সবই নিস্ফল আর ব্যর্থ, তুমি স্বমহিমায় ঠাই করে নিয়েছ আর আমার এ নিস্ফল প্রচেষ্টায় শুধু ছেলেমানুষী এক আমোদ অনুভব করেছ।
অনেক দিন থেকে তাই ভাবছি তোমাকে চিঠি লেখার কথা। কিভাবে কি করে তোমার সাথে আমার পরিচয়, আমাদের সম্পর্ক - এইসবকে আবারো ঝালাই করা। কে জানে, হয়ত এই চিঠির মাধ্যমে তোমার ছায়া আর অশরীরী অস্তিত্বকে নাড়া দিলেও দিতে পারি। কিংবা হয়ত নয়, শুধু অন্য কারো জীবনের মাঝে যাতে তোমার জীবনের ছায়া না দেখতে পাই - সে বাসনার তীব্রতা আর আকাংখাতে এ চিঠি লিখতে আমি প্ররোচিত হয়েছি। এক ধরনের দায় বদ্ধতা বলতে পারো। যে দায়বদ্ধতা শুধু আমার নিজের কাছে, তোমাকে এবং তোমার মত হাজারো অনেককে ভালবাসার ফলশ্রুতিতে, তাদের জীবনকে সরল রৈখিক দেখতে চাওয়ার মানসিকতাতে।
তোমার সাথে আমার পরিচয় হঠাৎ। ৯০ সালের কোন এক সকালে। দিন তারিখ মনে নেই। তোমার সেদিনকার উচ্ছলতা আর সাবলীলতা আমার মত নির্লিপ্ত মানুষের চেতনাকেও স্পর্শ করেছিল। তোমার মাঝে যে কিছুটা ব্যতিক্রমতা ছিল তা আমার চোখ এড়ায় নি। তোমার জামার ডিজাইন সেসময়টাতে ততটা জনপ্রিয় ছিল না। আর দশটা মধ্যবিত্তের মতই সাদামাটা পোশাক, তবুও তা দৃষ্টি আকর্ষন করে। ফাক পেয়ে আমি তোমাকে বললাম,
- থাকো তো ঢাকাতেই। তবে হলে কেন সিট নিলে?
- নাহ, আমার এরকম যাওয়া আসা ভাল লাগে না।
- যাক, ভাল হল। তুমি আর আমি পাশাপশি রুমে। প্রতিবেশীনি। যদিও ডিপার্টমেন্ট আলাদা।
- ফার্স্ট ইয়ার তো সবার জন্য একই। প্রায় সব সাবজেক্ট একই।
সেদিন সেভাবেই পরিচয়। তুমি আর আমি আমাদের হল আর বুয়েট জীবন শুরু করি। পাশাপশি রুম, কিন্তু তোমার আমার মন মানসিকতার বিস্তর পার্থক্য প্রথম থেকেই ছিল প্রকট। তাই তোমার সাথে আমার বন্ধুত্ব হয় নি। আমরা কিছুটা এড়িয়ে চলতাম একজন অন্য জনকে। তাহলেও আমি তোমার সাহসী, আর কিছুটা বেপরোয়া চালচলনকে প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখেছি। কিন্তু আমার মধ্যে তো ভাল লাগার কিছু ছিল না। তাই তুমি আমাকে পছন্দ করতে পারো নি, বন্ধুত্বের মর্যাদা কিংবা সম্মান দেয়া দূরে থাক।
মেধায় তোমার কোন কমতি ছিল না, কিন্তু সেটাকে একাডেমিক কাজে লাগানোতে ছিল তোমার উন্নাসিকতা। তুমি ক্লাসে যাবার চাইতে বরং স্বল্প পরিচিত একজনের জন্য অপেক্ষায় থাকতে বেশী ভালবাসতে। ক্রমেই সে তোমার সবচেয়ে প্রিয়জনে পরিনত হল। করিডোরে প্রতি মুহুর্তে কান সজাগ করে থাকতে কখন তোমার ডাক আসবে। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ রইল না। পরীক্ষা এলে কোনমতে উৎরে যেতে। হলের স্বাভাবিক নিয়ম নীতিকে উপেক্ষা করে তোমার যত্র তত্র ঘুরে বেড়ানো নিয়ে চারিদিকে কানাঘুষা, প্রবল সমালোচনা। যা তুমি মোটেও আমল দিলে না। একই অভিযোগে সিট ক্যানসেলের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সেসব কিছু তোমাকে মোটেও বিচলিত করে না। প্রিয় পুরুষটিই তখন তোমার কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে বেশী মূল্যবান।
এভাবেই যদি চলতো, তাহলে হয়ত সমাপ্তি টানা খুব কঠিন হত না। আমারও এ চিঠি লেখার কোন প্রয়োজন থাকত না। শুধু একটি লাইন, "অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে কালাতিপাত করিতে লাগিল।" দিয়ে উপসংহার টানা যেত। কিন্তু উপর ওয়ালার ইচ্ছা ছিল অন্য রকম। তোমাদের সম্পর্ক বার বার টানাপোড়েনের ক্ষতে ক্ষত বিক্ষত হতে লাগল। প্রিয় মানুষটির প্রশ্নবোধক নৈতিকতা ছিল সারা ক্যাম্পাসে আলোচিত একটি বিষয়। কিন্তু তারপরও তুমি হৃদয়ের দাবীতে ছুটে যেতে তারই কাছে। ভাবতে, মানুষ বদলায়, সেও হয়ত বদলাবে।
সময় বয়ে যায়। বছর ঘুরে বছর চলে যায়। শত্রুর কথাই সঠিক হল। তুমি চূড়ান্ত ভাবে প্রতারিত হলে। শুধু প্রেমিক পুরুষের কাছে নও, বরং সাথে সাথে সহোদরার কাছেও। তোমার মাধ্যমেই তাদের ছিল পরিচয়, আর তোমাকে মাইনাস করেই তারা চুক্তিবদ্ধ হল। কি করে এত কিছু হল, তা আমার জানা নেই। কিন্তু তুমি জেনেছ, তোমাকে মেনে নিতে হয়েছে এক ভয়ংকর, আপাত অসম্ভব এক বাস্তবতাকে। তাদের বিয়ের সানাই যখন বাজল, তখন তুমি পরাজয়ের ক্লান্তিতে ক্লান্ত। অথচ তোমার প্রিয় বোনের বিয়েতে তোমারই সবচেয়ে আনন্দিত হবার কথা। সে আনন্দ ভাগ করে নেয়ার কথা প্রিয় পুরুষটির সাথে। হায় নিয়তি। সে পুরুষ তো আর তখন তোমার কেউ নয়, বরং তোমার বোনের সুইট হার্ট। যাকে একদিন পৃথিবী ভেবে তুমি সমাজ সংসার সবকিছুকে অগ্রাহ্য করেছিলে, সে এখন তোমার বোনের আচলে বাধা। এই নিষ্ঠুর প্রতারনা তোমার হৃদয়কে ভেংগে দিল। মানুষ কি করে এত দুঃখ সইতে পারে।
সে মানসিক ভারসাম্যহীনতায় তুমি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করলে। সে ভুল শুধু তোমার জীবনকে উলট পালট করেনি, বরং পাল্টে দিয়েছে আরো কটি জীবনকে। সেদিনের বিষন্নতা কাটাতে তুমি নিজেকে সপে দিলে অযোগ্য অপদার্থ এক গুন্ডার হাতে। তোমার বিয়ে হল পরিবারের সবার অমতে। যার কাছে আশ্রয় পেতে চাইলে, কোন অংশেই তোমাকে বটবৃক্ষের ছায়া দেবার মানসিকতা তার ছিল না। এদিকে তোমার পরিজনরা তোমার বারংবার ঔদ্ধত্যে বিমূখ হয়ে গিয়েছিল। যার কারনে তুমি হারালে তোমার স্বজনদের সহযোগিতা।
আগেই বলেছি, তোমার মেধা ছিল অতুলনীয়। স্ট্রাকচার পরীক্ষার আগে যখন পুরো হলের সবাই আতংকিত, তখনও তুমি নিশ্চিন্ত মনে করিডোরের কলামে হেলান দিয়ে প্রহর গুনতে প্রিয় মানুষটির। এতটা অমনোযোগী, অথচ বুয়েট উৎরে যেতে কোন সমস্যা হয় নি। তাই, বিয়ে নিয়ে মনোমালিন্যে পরিবারের অসহযোগিতা তোমাকে দমাতে পারেনি মোটেই। তুমি চলে এলে আমেরিকায়, শুরু করলে পি এইচ ডি, সাথে সাথে চাকুরী। জীবন সংগ্রামে হার মানার মত মেয়ে তুমি নও।
সে সময়টা আমি নিজে ছিলাম নিজের ভূবনে অবগাহনরত। কিছু বিষয় নিয়ে আমাকে দাড়াতে হয়েছে কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি। ফলে অনেকটা জন বিচ্ছিন্ন অবস্থা ছিল আমার। তাই তুমি কবে আমেরিকায় এসেছ, কিংবা চাকুরী করতে - তার খবর রাখার মত অবস্থা আমার ছিল না।
কেটে যায় দিন, মাস। তারপর সেই ভয়ংকর দিন এল। সেদিনের শুরুটা ছিল আর দশটি দিনের মতই সাধারন, সাদামাটা। ফোন বাজছে, কিন্তু আমি আমার সদ্য ভূমিষ্ট কন্যার পরিচর্যা নিয়ে ব্যস্ত। আনসারিং মেশিনে মেসেজ রাখছে আমার বুয়েট ক্লাশমেট কাম বান্ধবী। সেটা শুনে আমার পৃথিবী যেন দুলে উঠল। স্তম্ভিত অবস্থার প্রাথমিক ঝড় কেটে যেতেই আমি সব কাজ ফেলে কল ব্যাক করলাম:
: হ্যালো। ফোন করেছিলে।
: হ্যা। আমাদের সাথের নীতুকে চিনতে? ও মারা গেছে।
: মানে? কি বলছ এসব। - হতভম্ব অবস্থা কিছুটা কাটতে আমার পাল্টা প্রশ্ন।
: হয় খুন, নয় আত্মহত্যা। পুলিশ এখনও শিওর নয়। আমি এর বেশী কিছু জানি না।
: কি বলছ কিছু বুঝতে পারছি না। যাহোক, আমি দেখি এর প্রতিবেশী সুমিকে ফোন করি। ও নিশ্চয়ই জানবে।
ফোন রেখে আবার ফোন করলাম।
:হ্যালো সুমি।
: হ্যা। বলছি।
: নীতু নাকি মারা গেছে।
: কাল রাতে। ঘুমের মধ্যে।
: আর কি জানো।
: এই সকালে নীতুর স্বামী সবাইকে ফোন করে বলছে ও নাকি আত্মহত্যা করেছে।
: ও তো স্ট্রাগল করা একটা মেয়ে। আত্মহত্যা করতে যাবে কেন?
: সেটাই তো কথা। এটা খুন ছাড়া আর কিছু নয়। এখন পুলিশ ইনভেস্টিগেট করছে।
: আচ্ছা, তুমি কি কিছু জান। ওদের মধ্যে কি কোন গোলমাল তো চলছিলো?
: তা তো ছিলই। সে বাসা বদলাতে চাইতো। কিন্তু নীতু তাতে রাজী ছিল না। আগের রাতেও মানুষ ডেকে একটা সালিশ টাইপের হয়েছে।
এরই মাঝে মেয়ে আমার কেদে উঠল। মেয়ের কারনে সেদিন আর কথা আগাল না। এদিকে মাস খানেক ধরে এর ওর কাছ থেকে হাজারো স্ক্যান্ডাল শুনতে শুনতে আমি নিজেও হতভম্ব। তাই দিন কয়েক বাদে আবার সুমিকে ফোন করি।
: স্যরি সুমি। খালি দরকারে ফোন করি। কিছু মনে কর না।
: নাহ, কি ভাবব। আমিও তো অফিস নিয়ে মহাব্যস্ত।
: নীতুর ঘটনা নিয়ে অনেক কিছু শুনছি। কি বিষয়।
: কি শুনছ, জানি না। তবে নীতু যে স্বামীর হাতে খুন হয়েছে সেটা শিওর। নীতু ডিভোর্সের প্ল্যান করছিল।
: ডিভোর্স? কেন? তার বাবার হাজারো চাপ সত্ত্বেও তো সে ডিভোর্স করে নি। সেজন্য তার বাবা ভিসা পর্যন্ত প্রসেস করলেন না। আজকে এত পরে সে কেন ডিভোর্সের চিন্তা করছিল?
: আসলে এখানে তৃতীয় আরেকজন জড়িত।
: মানে? অন্য কারো সাথে নীতুর অ্যাফেয়ার চলছিলো?
: ওখানেরই এক ছেলের সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠছিলো। সে ছেলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে তাদের সম্পর্কের কথা। ওটাই খুনের মোটিভ।
: কি বলছ। এটা তো ওয়ান সাইডেড হতে পারে। হয়ত নীতুর পক্ষ থেকে কোন দায় নেই।
: নাহ, ওর কাছে নীতুর একটা চিঠিও পাওয়া গেছে। খুব ডিপলি ইনভলভড ছিল। চিঠি একটা প্রমান।
আমি নীরব হইলাম। আর তেমন কিছু জানার নেই। তোমাকে সুমিও খুব ভালবাসত। তাই অনেক কিছু সে বলতে চায় নি। সুমির নীরবতা, ইতস্তত ভাব আমাকে বুঝিয়ে দেয় অনেক কিছু। আমি বুঝতে পারি তোমার এ সম্পর্ক প্লেটোনিক ছিল না। কারো কাছে দায়বদ্ধতা নিয়ে তুমি কখনও চল নি, তাই এরকম সম্পর্ক তোমার কাছে বিন্দুমাত্র অস্বাভাবিক মনে হয় নি। সন্তান কিংবা সমাজ কেউই তোমার কাছে বিবেচ্য নয়। অবলীলায় তাদের উপেক্ষা করে নিজের খুশীমত চলার কঠিনতম ক্ষমতাটুকু তোমার ছিল।
কল্পনা ছেড়ে আমি ফিরে আসি বাস্তবে। সুমিকে জিজ্ঞাসা করি:
: ওর বাচ্চাদের কি অবস্থা?
: ওদের কাস্টডি নিয়ে এখনও কোন সিদ্ধান্ত হয় নি।
: এই যে আগের রাতে সালিশ টাইপের বৈঠক হল, তাতে কি হল?
: কি আর হবে। নীতু উড়িয়ে দেয় সব। বলেছে, একটা দুইটা অ্যাফেয়ার এরকম সবারই থাকে।
আমি ফোন রেখে দেই। তোমাকে ভাবতে থাকি। মৃত্যুর সময়টা ছিলে তুমি গাঢ ঘুমে। সে ঘুম আর কখনও ভাংগেনি। স্বপ্ন ভংগের বেদনা কাটাতে যে মানুষটিকে নিয়ে তুমি আবারও আশার স্বপ্ন দেখেছিলে, যার সন্তানকে তুমি পৃথিবীতে এনেছিলে - সেই ছিল তোমার ঘাতক, হত্যাকারী। যাদেরকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে, তারাই তোমাকে অমর্যাদা আর প্রতারনা করেছে সবচেয়ে বেশী। যাদের জন্য সমাজ সংসারের রক্তচক্ষুকে পাশ কাটিয়ে গিয়েছ, তারা তোমার অনুভূতিকে মাড়িয়ে যেতে দ্বিধা করেনি। এমন কি যার সন্তানদের পৃথিবীতে আনার দুর্বহ কষ্ট টুকু করেছ তার দ্বারাই এই পৃথিবীর আলো বাতাসের অধিকারটুকু পর্যন্ত হারিয়েছ।
শিরোনামেই বলেছি, তোমায় আমি ক্ষমা করতে পারছি না। তুমি কি ভেবেছ এই অক্ষমতা আমার প্রতি তোমার অবহেলার সে সংকীর্ন মানসিকতা থেকে সৃষ্ট? কিংবা, তোমাকে নৈতিকতার কাঠগড়ায় দাড়িয়ে তোমার বিচার করতে চাইছি? না, সেসবের কোনটাই নয়। তুমি এই বিশাল পৃথিবীতে বেচে থাকার অধিকার পাও নি - এত বড় অন্যায় সহ্য করে তুমি তো নীলকন্ঠের মত সমস্ত গরলকে শুষে নিয়েছ। কোন অভিযোগ, ক্ষোভ কিংবা সমালোচনার অবকাশ মাত্র রাখো নি।
তারপরও আমি তোমাকে ক্ষমা করতে পারছি না। যখন তোমার কথা ভাবি, তখন সাথে সাথে আরো দুটি শিশুর কথা আমার মনে উকি দিয়ে যায় - যারা আজ আশ্রয় হীন, ঠিকানা বিহীন। পরকীয়ার আসক্ত মা আর ঘাতক পিতার পরিচয়ই আজ তাদের সম্বল। অথচ তুমি তোমার জীবনের অপূর্নতাকে ভরিয়ে দিতে পারতে এই নিষ্পাপ দুটি শিশুর হাসি দিয়ে। তারাই হতে পারত তোমার পৃথিবী। তোমার কোলে তাদের নিরাপদ আশ্রয় হতে পারত তোমার জীবনের সবচেয়ে ব্ড় পাওয়া।
হয়ত কষ্ট পাচ্ছ আমার কথায়, কিংবা হয়ত নয়। হয়ত আগের মতই ঠোট উল্টে বুঝিয়ে দেবে, আমাকে গুরুত্ব দেবার মত মানসিকতা তোমার নেই। হয়ত তেড়ে এসে বলবে, আমি না হয় তোমার চোখে খারাপ কিন্তু তুমি কেন আমার সম্পর্কে এতসব লিখছ, কেন মানুষকে এত কথা বলছ। যদি আমাকে ভালই বাস, তবে কেন এভাবে ছোট করছ অন্যের সামনে।
সেক্ষেত্রে আমার ছোট্ট একটি কৈফিয়ত। এ চিঠিতে তোমাকে নিয়ে যেসব লিখেছি তার অনেকখানিতে রয়েছে আমার কল্পনা। তাই পাঠকের কাছে এ নিছক একটা গল্প। শুধু তুমি আর আমি জানি এ কাহিনীতে সত্যের ভাগটুকু।
আমার এ চিঠি কোনদিন তুমি পড়বে, এ অসম্ভব ভাবনা কখনই আমার মনে খেলে যায় নি। কি করেই বা পড়বে, তুমি তো এখন আর এ ভূবনের কেউ নও। এ জগতের মেয়াদ শেষ করে অনেক আগেই অন্য ভূবনে নিজের বাস গড়েছ। বড় অসময়ে চলে গেছ, তবে ফেলে গিয়েছ একরাশ স্মৃতি! আমাদের ছেড়ে বিদায় নেবার সে যাওয়াটা যেন সম্পূর্ন নয় - রেখে গিয়েছ ছায়া তোমার বংশধরদের মাঝে। দৃঢ়ভাবে নিজের আসন গেড়ে নিয়েছ এই পৃথিবীতে। বহুদূরে চলে গেছ, তবু বার বার আমরা তোমার অপার্থিব কোলাহল অনুভব করি, চারিপাশে শুনতে পাই তোমার অব্যক্ত ধ্বনি - আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেব না ভুলিতে।
তোমার কাছে আমি হয়ত বা মূল্যহীন, অপাংক্তেয়। আমার কথা শোনার কোন ফুসরত তোমার কখনই ছিল না। কিংবা কখনও যদি আমার কোন কথা দুদন্ডের জন্য শুনেও থেকেছ, তবুও তা তোমার কাছে ছিল একেবারেই গুরুত্ব হীন, আবার কখনও বা উপহাসের বিষয় বস্তু। থাক না হয় সেসব কথা এখন। তবে জানবে, এত অবহেলা সত্ত্বেও আমার কাছে তুমি কোন অংশে গুরুত্বহীন নও। প্রবাসের দুর্লভ অবসরের হাজারো স্মৃতি চারনে হাজার মুখের যে মুখটি আমাকে সবচেয়ে বেশী নাড়া দিয়ে যায়, তা তোমার মুখ। প্লে ব্যাক হয়ে ভাসতে থাকে তোমার আনন্দ, অভিমান, উচ্ছাস কিংবা প্রিয় মানুষটির জন্য অপেক্ষার আকুলতা। এ পৃথিবীতে কাটিয়ে যাওয়া তোমার দিনলিপিতে প্রতিটি প্রত্যক্ষকৃত ক্ষন আমার স্মৃতিতে অম্লান। অথচ, তোমাকে তো আমি সবসময়ই ভুলতে চেয়েছি। আমার অনুভূতি থেকে বার বার সরিয়ে দিতে চেয়েছি তোমাকে, তোমার সমস্ত চিহ্নকে। সে চেষ্টার সবই নিস্ফল আর ব্যর্থ, তুমি স্বমহিমায় ঠাই করে নিয়েছ আর আমার এ নিস্ফল প্রচেষ্টায় শুধু ছেলেমানুষী এক আমোদ অনুভব করেছ।
অনেক দিন থেকে তাই ভাবছি তোমাকে চিঠি লেখার কথা। কিভাবে কি করে তোমার সাথে আমার পরিচয়, আমাদের সম্পর্ক - এইসবকে আবারো ঝালাই করা। কে জানে, হয়ত এই চিঠির মাধ্যমে তোমার ছায়া আর অশরীরী অস্তিত্বকে নাড়া দিলেও দিতে পারি। কিংবা হয়ত নয়, শুধু অন্য কারো জীবনের মাঝে যাতে তোমার জীবনের ছায়া না দেখতে পাই - সে বাসনার তীব্রতা আর আকাংখাতে এ চিঠি লিখতে আমি প্ররোচিত হয়েছি। এক ধরনের দায় বদ্ধতা বলতে পারো। যে দায়বদ্ধতা শুধু আমার নিজের কাছে, তোমাকে এবং তোমার মত হাজারো অনেককে ভালবাসার ফলশ্রুতিতে, তাদের জীবনকে সরল রৈখিক দেখতে চাওয়ার মানসিকতাতে।
তোমার সাথে আমার পরিচয় হঠাৎ। ৯০ সালের কোন এক সকালে। দিন তারিখ মনে নেই। তোমার সেদিনকার উচ্ছলতা আর সাবলীলতা আমার মত নির্লিপ্ত মানুষের চেতনাকেও স্পর্শ করেছিল। তোমার মাঝে যে কিছুটা ব্যতিক্রমতা ছিল তা আমার চোখ এড়ায় নি। তোমার জামার ডিজাইন সেসময়টাতে ততটা জনপ্রিয় ছিল না। আর দশটা মধ্যবিত্তের মতই সাদামাটা পোশাক, তবুও তা দৃষ্টি আকর্ষন করে। ফাক পেয়ে আমি তোমাকে বললাম,
- থাকো তো ঢাকাতেই। তবে হলে কেন সিট নিলে?
- নাহ, আমার এরকম যাওয়া আসা ভাল লাগে না।
- যাক, ভাল হল। তুমি আর আমি পাশাপশি রুমে। প্রতিবেশীনি। যদিও ডিপার্টমেন্ট আলাদা।
- ফার্স্ট ইয়ার তো সবার জন্য একই। প্রায় সব সাবজেক্ট একই।
সেদিন সেভাবেই পরিচয়। তুমি আর আমি আমাদের হল আর বুয়েট জীবন শুরু করি। পাশাপশি রুম, কিন্তু তোমার আমার মন মানসিকতার বিস্তর পার্থক্য প্রথম থেকেই ছিল প্রকট। তাই তোমার সাথে আমার বন্ধুত্ব হয় নি। আমরা কিছুটা এড়িয়ে চলতাম একজন অন্য জনকে। তাহলেও আমি তোমার সাহসী, আর কিছুটা বেপরোয়া চালচলনকে প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখেছি। কিন্তু আমার মধ্যে তো ভাল লাগার কিছু ছিল না। তাই তুমি আমাকে পছন্দ করতে পারো নি, বন্ধুত্বের মর্যাদা কিংবা সম্মান দেয়া দূরে থাক।
মেধায় তোমার কোন কমতি ছিল না, কিন্তু সেটাকে একাডেমিক কাজে লাগানোতে ছিল তোমার উন্নাসিকতা। তুমি ক্লাসে যাবার চাইতে বরং স্বল্প পরিচিত একজনের জন্য অপেক্ষায় থাকতে বেশী ভালবাসতে। ক্রমেই সে তোমার সবচেয়ে প্রিয়জনে পরিনত হল। করিডোরে প্রতি মুহুর্তে কান সজাগ করে থাকতে কখন তোমার ডাক আসবে। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ রইল না। পরীক্ষা এলে কোনমতে উৎরে যেতে। হলের স্বাভাবিক নিয়ম নীতিকে উপেক্ষা করে তোমার যত্র তত্র ঘুরে বেড়ানো নিয়ে চারিদিকে কানাঘুষা, প্রবল সমালোচনা। যা তুমি মোটেও আমল দিলে না। একই অভিযোগে সিট ক্যানসেলের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সেসব কিছু তোমাকে মোটেও বিচলিত করে না। প্রিয় পুরুষটিই তখন তোমার কাছে দুনিয়ার সবচেয়ে বেশী মূল্যবান।
এভাবেই যদি চলতো, তাহলে হয়ত সমাপ্তি টানা খুব কঠিন হত না। আমারও এ চিঠি লেখার কোন প্রয়োজন থাকত না। শুধু একটি লাইন, "অতঃপর তাহারা সুখে শান্তিতে কালাতিপাত করিতে লাগিল।" দিয়ে উপসংহার টানা যেত। কিন্তু উপর ওয়ালার ইচ্ছা ছিল অন্য রকম। তোমাদের সম্পর্ক বার বার টানাপোড়েনের ক্ষতে ক্ষত বিক্ষত হতে লাগল। প্রিয় মানুষটির প্রশ্নবোধক নৈতিকতা ছিল সারা ক্যাম্পাসে আলোচিত একটি বিষয়। কিন্তু তারপরও তুমি হৃদয়ের দাবীতে ছুটে যেতে তারই কাছে। ভাবতে, মানুষ বদলায়, সেও হয়ত বদলাবে।
সময় বয়ে যায়। বছর ঘুরে বছর চলে যায়। শত্রুর কথাই সঠিক হল। তুমি চূড়ান্ত ভাবে প্রতারিত হলে। শুধু প্রেমিক পুরুষের কাছে নও, বরং সাথে সাথে সহোদরার কাছেও। তোমার মাধ্যমেই তাদের ছিল পরিচয়, আর তোমাকে মাইনাস করেই তারা চুক্তিবদ্ধ হল। কি করে এত কিছু হল, তা আমার জানা নেই। কিন্তু তুমি জেনেছ, তোমাকে মেনে নিতে হয়েছে এক ভয়ংকর, আপাত অসম্ভব এক বাস্তবতাকে। তাদের বিয়ের সানাই যখন বাজল, তখন তুমি পরাজয়ের ক্লান্তিতে ক্লান্ত। অথচ তোমার প্রিয় বোনের বিয়েতে তোমারই সবচেয়ে আনন্দিত হবার কথা। সে আনন্দ ভাগ করে নেয়ার কথা প্রিয় পুরুষটির সাথে। হায় নিয়তি। সে পুরুষ তো আর তখন তোমার কেউ নয়, বরং তোমার বোনের সুইট হার্ট। যাকে একদিন পৃথিবী ভেবে তুমি সমাজ সংসার সবকিছুকে অগ্রাহ্য করেছিলে, সে এখন তোমার বোনের আচলে বাধা। এই নিষ্ঠুর প্রতারনা তোমার হৃদয়কে ভেংগে দিল। মানুষ কি করে এত দুঃখ সইতে পারে।
সে মানসিক ভারসাম্যহীনতায় তুমি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করলে। সে ভুল শুধু তোমার জীবনকে উলট পালট করেনি, বরং পাল্টে দিয়েছে আরো কটি জীবনকে। সেদিনের বিষন্নতা কাটাতে তুমি নিজেকে সপে দিলে অযোগ্য অপদার্থ এক গুন্ডার হাতে। তোমার বিয়ে হল পরিবারের সবার অমতে। যার কাছে আশ্রয় পেতে চাইলে, কোন অংশেই তোমাকে বটবৃক্ষের ছায়া দেবার মানসিকতা তার ছিল না। এদিকে তোমার পরিজনরা তোমার বারংবার ঔদ্ধত্যে বিমূখ হয়ে গিয়েছিল। যার কারনে তুমি হারালে তোমার স্বজনদের সহযোগিতা।
আগেই বলেছি, তোমার মেধা ছিল অতুলনীয়। স্ট্রাকচার পরীক্ষার আগে যখন পুরো হলের সবাই আতংকিত, তখনও তুমি নিশ্চিন্ত মনে করিডোরের কলামে হেলান দিয়ে প্রহর গুনতে প্রিয় মানুষটির। এতটা অমনোযোগী, অথচ বুয়েট উৎরে যেতে কোন সমস্যা হয় নি। তাই, বিয়ে নিয়ে মনোমালিন্যে পরিবারের অসহযোগিতা তোমাকে দমাতে পারেনি মোটেই। তুমি চলে এলে আমেরিকায়, শুরু করলে পি এইচ ডি, সাথে সাথে চাকুরী। জীবন সংগ্রামে হার মানার মত মেয়ে তুমি নও।
সে সময়টা আমি নিজে ছিলাম নিজের ভূবনে অবগাহনরত। কিছু বিষয় নিয়ে আমাকে দাড়াতে হয়েছে কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি। ফলে অনেকটা জন বিচ্ছিন্ন অবস্থা ছিল আমার। তাই তুমি কবে আমেরিকায় এসেছ, কিংবা চাকুরী করতে - তার খবর রাখার মত অবস্থা আমার ছিল না।
কেটে যায় দিন, মাস। তারপর সেই ভয়ংকর দিন এল। সেদিনের শুরুটা ছিল আর দশটি দিনের মতই সাধারন, সাদামাটা। ফোন বাজছে, কিন্তু আমি আমার সদ্য ভূমিষ্ট কন্যার পরিচর্যা নিয়ে ব্যস্ত। আনসারিং মেশিনে মেসেজ রাখছে আমার বুয়েট ক্লাশমেট কাম বান্ধবী। সেটা শুনে আমার পৃথিবী যেন দুলে উঠল। স্তম্ভিত অবস্থার প্রাথমিক ঝড় কেটে যেতেই আমি সব কাজ ফেলে কল ব্যাক করলাম:
: হ্যালো। ফোন করেছিলে।
: হ্যা। আমাদের সাথের নীতুকে চিনতে? ও মারা গেছে।
: মানে? কি বলছ এসব। - হতভম্ব অবস্থা কিছুটা কাটতে আমার পাল্টা প্রশ্ন।
: হয় খুন, নয় আত্মহত্যা। পুলিশ এখনও শিওর নয়। আমি এর বেশী কিছু জানি না।
: কি বলছ কিছু বুঝতে পারছি না। যাহোক, আমি দেখি এর প্রতিবেশী সুমিকে ফোন করি। ও নিশ্চয়ই জানবে।
ফোন রেখে আবার ফোন করলাম।
:হ্যালো সুমি।
: হ্যা। বলছি।
: নীতু নাকি মারা গেছে।
: কাল রাতে। ঘুমের মধ্যে।
: আর কি জানো।
: এই সকালে নীতুর স্বামী সবাইকে ফোন করে বলছে ও নাকি আত্মহত্যা করেছে।
: ও তো স্ট্রাগল করা একটা মেয়ে। আত্মহত্যা করতে যাবে কেন?
: সেটাই তো কথা। এটা খুন ছাড়া আর কিছু নয়। এখন পুলিশ ইনভেস্টিগেট করছে।
: আচ্ছা, তুমি কি কিছু জান। ওদের মধ্যে কি কোন গোলমাল তো চলছিলো?
: তা তো ছিলই। সে বাসা বদলাতে চাইতো। কিন্তু নীতু তাতে রাজী ছিল না। আগের রাতেও মানুষ ডেকে একটা সালিশ টাইপের হয়েছে।
এরই মাঝে মেয়ে আমার কেদে উঠল। মেয়ের কারনে সেদিন আর কথা আগাল না। এদিকে মাস খানেক ধরে এর ওর কাছ থেকে হাজারো স্ক্যান্ডাল শুনতে শুনতে আমি নিজেও হতভম্ব। তাই দিন কয়েক বাদে আবার সুমিকে ফোন করি।
: স্যরি সুমি। খালি দরকারে ফোন করি। কিছু মনে কর না।
: নাহ, কি ভাবব। আমিও তো অফিস নিয়ে মহাব্যস্ত।
: নীতুর ঘটনা নিয়ে অনেক কিছু শুনছি। কি বিষয়।
: কি শুনছ, জানি না। তবে নীতু যে স্বামীর হাতে খুন হয়েছে সেটা শিওর। নীতু ডিভোর্সের প্ল্যান করছিল।
: ডিভোর্স? কেন? তার বাবার হাজারো চাপ সত্ত্বেও তো সে ডিভোর্স করে নি। সেজন্য তার বাবা ভিসা পর্যন্ত প্রসেস করলেন না। আজকে এত পরে সে কেন ডিভোর্সের চিন্তা করছিল?
: আসলে এখানে তৃতীয় আরেকজন জড়িত।
: মানে? অন্য কারো সাথে নীতুর অ্যাফেয়ার চলছিলো?
: ওখানেরই এক ছেলের সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠছিলো। সে ছেলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে তাদের সম্পর্কের কথা। ওটাই খুনের মোটিভ।
: কি বলছ। এটা তো ওয়ান সাইডেড হতে পারে। হয়ত নীতুর পক্ষ থেকে কোন দায় নেই।
: নাহ, ওর কাছে নীতুর একটা চিঠিও পাওয়া গেছে। খুব ডিপলি ইনভলভড ছিল। চিঠি একটা প্রমান।
আমি নীরব হইলাম। আর তেমন কিছু জানার নেই। তোমাকে সুমিও খুব ভালবাসত। তাই অনেক কিছু সে বলতে চায় নি। সুমির নীরবতা, ইতস্তত ভাব আমাকে বুঝিয়ে দেয় অনেক কিছু। আমি বুঝতে পারি তোমার এ সম্পর্ক প্লেটোনিক ছিল না। কারো কাছে দায়বদ্ধতা নিয়ে তুমি কখনও চল নি, তাই এরকম সম্পর্ক তোমার কাছে বিন্দুমাত্র অস্বাভাবিক মনে হয় নি। সন্তান কিংবা সমাজ কেউই তোমার কাছে বিবেচ্য নয়। অবলীলায় তাদের উপেক্ষা করে নিজের খুশীমত চলার কঠিনতম ক্ষমতাটুকু তোমার ছিল।
কল্পনা ছেড়ে আমি ফিরে আসি বাস্তবে। সুমিকে জিজ্ঞাসা করি:
: ওর বাচ্চাদের কি অবস্থা?
: ওদের কাস্টডি নিয়ে এখনও কোন সিদ্ধান্ত হয় নি।
: এই যে আগের রাতে সালিশ টাইপের বৈঠক হল, তাতে কি হল?
: কি আর হবে। নীতু উড়িয়ে দেয় সব। বলেছে, একটা দুইটা অ্যাফেয়ার এরকম সবারই থাকে।
আমি ফোন রেখে দেই। তোমাকে ভাবতে থাকি। মৃত্যুর সময়টা ছিলে তুমি গাঢ ঘুমে। সে ঘুম আর কখনও ভাংগেনি। স্বপ্ন ভংগের বেদনা কাটাতে যে মানুষটিকে নিয়ে তুমি আবারও আশার স্বপ্ন দেখেছিলে, যার সন্তানকে তুমি পৃথিবীতে এনেছিলে - সেই ছিল তোমার ঘাতক, হত্যাকারী। যাদেরকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে, তারাই তোমাকে অমর্যাদা আর প্রতারনা করেছে সবচেয়ে বেশী। যাদের জন্য সমাজ সংসারের রক্তচক্ষুকে পাশ কাটিয়ে গিয়েছ, তারা তোমার অনুভূতিকে মাড়িয়ে যেতে দ্বিধা করেনি। এমন কি যার সন্তানদের পৃথিবীতে আনার দুর্বহ কষ্ট টুকু করেছ তার দ্বারাই এই পৃথিবীর আলো বাতাসের অধিকারটুকু পর্যন্ত হারিয়েছ।
শিরোনামেই বলেছি, তোমায় আমি ক্ষমা করতে পারছি না। তুমি কি ভেবেছ এই অক্ষমতা আমার প্রতি তোমার অবহেলার সে সংকীর্ন মানসিকতা থেকে সৃষ্ট? কিংবা, তোমাকে নৈতিকতার কাঠগড়ায় দাড়িয়ে তোমার বিচার করতে চাইছি? না, সেসবের কোনটাই নয়। তুমি এই বিশাল পৃথিবীতে বেচে থাকার অধিকার পাও নি - এত বড় অন্যায় সহ্য করে তুমি তো নীলকন্ঠের মত সমস্ত গরলকে শুষে নিয়েছ। কোন অভিযোগ, ক্ষোভ কিংবা সমালোচনার অবকাশ মাত্র রাখো নি।
তারপরও আমি তোমাকে ক্ষমা করতে পারছি না। যখন তোমার কথা ভাবি, তখন সাথে সাথে আরো দুটি শিশুর কথা আমার মনে উকি দিয়ে যায় - যারা আজ আশ্রয় হীন, ঠিকানা বিহীন। পরকীয়ার আসক্ত মা আর ঘাতক পিতার পরিচয়ই আজ তাদের সম্বল। অথচ তুমি তোমার জীবনের অপূর্নতাকে ভরিয়ে দিতে পারতে এই নিষ্পাপ দুটি শিশুর হাসি দিয়ে। তারাই হতে পারত তোমার পৃথিবী। তোমার কোলে তাদের নিরাপদ আশ্রয় হতে পারত তোমার জীবনের সবচেয়ে ব্ড় পাওয়া।
হয়ত কষ্ট পাচ্ছ আমার কথায়, কিংবা হয়ত নয়। হয়ত আগের মতই ঠোট উল্টে বুঝিয়ে দেবে, আমাকে গুরুত্ব দেবার মত মানসিকতা তোমার নেই। হয়ত তেড়ে এসে বলবে, আমি না হয় তোমার চোখে খারাপ কিন্তু তুমি কেন আমার সম্পর্কে এতসব লিখছ, কেন মানুষকে এত কথা বলছ। যদি আমাকে ভালই বাস, তবে কেন এভাবে ছোট করছ অন্যের সামনে।
সেক্ষেত্রে আমার ছোট্ট একটি কৈফিয়ত। এ চিঠিতে তোমাকে নিয়ে যেসব লিখেছি তার অনেকখানিতে রয়েছে আমার কল্পনা। তাই পাঠকের কাছে এ নিছক একটা গল্প। শুধু তুমি আর আমি জানি এ কাহিনীতে সত্যের ভাগটুকু।
Monday, January 19, 2009
new post
পনের বছর আগে বিয়ে নামক শিকলের বেড়ী পায়ে পড়ার পরেও আমি বেশ কিছু দিন বুঝতে পারিনি বন্দীত্বকে। হাড়ে হাড়ে উপলদ্ধি করি সেদিন, যেদিন জন্ম হল আমার ছেলের। থমকে পড়ল যেন আমার সমস্ত প্রানোচ্ছলতা। বলতে গেলে স্বাধীনতার মূল্যটুকু টের পেলাম সেদিন, যেদিন এই অমূল্য সম্পদ চিরতরে বিসর্জিত হয়েছে। কিন্তু জীবন তো বয়ে চলা এক নদীর মত, যার মূল গতি কখনও থেমে থাকে না। তাই আমিও এই বন্দীপ্রায় জীবনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে চাইলাম। হারানোর দুঃখকে ভুলতে চাইলাম মাতৃত্বের আনন্দ দিয়ে। যে আনন্দ সৃষ্টির অবর্ননীয় আনন্দ। স্বাধীনতা হারানোর অব্যক্ত বেদনা কাটিয়ে দিল ছোট একটি শিশুর নির্মল হাসি। দিনের পর দিন একঘেয়ে গৃহবন্দী জীবনের আমার একমাত্র বৈচিত্র্য তার বিষ্ময় ভরা দৃষ্টি! বিষ্ময় ভরা দৃষ্টিতে সে এই পৃথিবীকে বোঝার চেষ্টা করে। তার সে দৃষ্টিতে থাকে আমার প্রতি নির্ভরতা। আমিই হয়ে যাই তার বিশ্বাস আর আস্থার কেন্দ্রবিন্দু। আমিও তার সমস্ত অনুভূতি আর বিষ্ময়কে নিজের মাঝে ধরে রাখতে চাইলাম। দেখলাম, কি অবাক বিষ্ময়ে সে স্বাগতম জানিয়ে বরন করেছে আরো একটি শিশুকে। আমি শিকলে আরো বেশী আস্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেলাম।
সেদিন থেকে আমার দিন গুলো যেন ছকে বাধা পাজল। একবার সলভড হয়ে গেলে সে পাজলে আর খুব বেশী বৈচিত্র্য নেই। দিনের কোন ক্ষনে আমার কি ডিউটি তা আগে ভাগে ঠিক করা এবং সে অনুযায়ী মাথায় প্রোগ্রাম করে রাখা। ফলে সকাল থেকে উঠে মোটামুটি এক ধ্যনের ব্যস্ততায় সারা দিনের সময়টা কেটে যায় অনেকটা রোবটের মত করে।
সকালের অংশটুকু দিনের অন্য সময়ের চেয়ে আমার কিছুটা বেশী ব্যস্ত যায়। ঘুম থেকে উঠে মেয়েকে গোসল করাও, ড্রেস পড়াও, স্কুলে দেবার জন্যে এদের টিফিন বানাও ইত্যাদি হাজারোটা কাজে কখন যে সময় বয়ে যায় কে জানে। বার বার ঘড়ির দিকে সকরুন ভাবে তাকিয়ে আল্লাহ আল্লাহ করি যাতে সময়ের করুনাটুকু কপালে জোটে। এদের যাতে সময়মত স্কুলে দিতে পারি। এদিকে ভেতরে ভেতরে একটা ভয় কাজ করে মেয়ে না আবার বেকে বসে স্কুলে না যাওয়ার জন্যে। এই কাজটা সে মাঝে মধ্যে করে থাকে। ঘুম থেকে উঠে ঘোষনা দেয়া যে স্কুলে যাবে না। সেসব দিন কাটে ভীষন ভয়াবহ। বহু সাধ্য সাধনার পরে, এটা ওটা কিনে দেবার প্রতিশ্রুতির পরে তাকে স্কুলে পাঠানো যায়। প্রতিটি প্রতিশ্রুত বস্তু তাকে দিতে হয় সপ্তাহ শেষ হবার আগেই।
এই ব্লগের আর দশ জনের মত আমার দুই শিশুর পাকাপোক্ত ধারনা যে আমার মাথায় গোবর ছাড়া আসলে আর কিছু নেই। ছেলে বিরক্ত হয়ে দাবী আমি অংক করিয়ে দিলে সেটা সবসময় হয় ভুল। মেয়েও মনে করে আম্মুর দেখানো পড়া টিচার ঠিক মনে করে না। গম্ভীর হয়ে সে জানায় আমার কাছে পড়তে মোটেও আগ্রহী নয়। হিউম্যান কমিউনিকেশনের পুরো ব্যপারটি আসলে ডুপ্লেক্স, মানে দ্বিপাক্ষিক। তারা আমার সংগ পছন্দ করেনা বলে আমার নিজেরও তাদের পড়াশোনা দেখানোর প্রতি বেশী আগ্রহ নেই। নিজেরা যা পারে, সেটাই তারা হোম ওয়ার্ক করে। আমি বেশী একটা নাক গলাই না। করুক, তারা নিজেদের মত করে। তবে মাঝে মাঝে কিছু বাংলা কবিতা পড়ে শোনাই। অবাক হয়ে দেখি সেটা আবার তাদের খুব আকর্ষন করে। আমি আবৃতির ঢং এ যখন বলি,
মনে ভাবিলাম মোরে ভগবান রাখিবে না মোহ গর্তে
তাই লিখে দিল বিশ্ব নিখিল দু বিঘার পরিবর্তে।
আমার ছেলে তখন নিবিষ্ট ভংগিতে শুনতে থাকে। তাদের নিষ্পাপ চোখের মুগ্ধতা আমাকে একরাশ আনন্দ দেয়। একে একে শোনাই কাজলা দিদি, পুরাতন ভৃত্য, সোনার তরী - ঠাই নাই ঠাই নাই ছোট সে তরী। তার মনোযোগের যেন অন্ত নেই। আগ্রহী শ্রোতা পেয়ে আমারও বেশ ভাল লাগে। কখনও কখনও সে আব্দার তোলে ইংরেজী করে দিতে। সহসা বাতাস ফেলি গেল শ্বাস শাখা দুলাইয়া গাছে - এর ইংরেজী কি। আমি বুঝিয়ে দেই। বলি, এটা হল মেটাফোর যা তুমি কয়েকদিন আগে পড়লে। বাতাসে শ্বাস ফেলা মানে জোড়ে বাতাস বয়ে, বুঝলে। আর মেয়ে ভাংগা ভাংগা বাংলায় আমাকে অনুকরন করার চেষ্টা করে: মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই। ট্রান্সলেশনের আব্দার সেও করে থাকে। মাঝে মাঝে আমিও পাল্টা আব্দার তুলি। তাদেরকে বলি, বাংলা বোঝার চেষ্টা করতে। কিন্তু অবধারিত ভাবেই আমিই সবসময় হেরে যাই তাদের কাছে।
বিভোর হয়ে আবৃতি শুনতে ভালবাসলেও বাংলাদেশের যে ব্যপারটিতে তাদের কোন কৌতুহল নেই - তা হল রাজনীতি। আমি বিভিন্ন সময় খালেদা, হাসিনা, মইন ইত্যাদি নামগুলো এবং তাদের তাৎপর্য এদের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছি। কিন্তু এরা মোটেও এসবে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায় নি। এটা আমার কিছুটা অবাক করে। বিশেষত আমার ছেলে যেখানে নিজের পড়ার ঘরে বাংলাদেশের ম্যাপ ঝুলিয়েছে, ক্রিকেট খেলায় বাংলাদেশের ব্যপারে সবসময়ই উৎসাহী। তাই ভেবেছিলাম হয়ত বাংলাদেশের নির্বাচন বা রাজনীতি নিয়েও কিছুটা কৌতুহল থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু হতাশ হয়ে দেখলাম সে গুড়ে বালি ছাড়া আর কিছু নেই। খালেদা হাসিনা নামগুলো পর্যন্ত শুনতে চায় না।
বাংলাদেশের রাজনীতি বিষয়ে নির্লিপ্ত হলেও এরা কিন্তু আমেরিকার রাজনীতি নিয়ে মাঝে মাঝে গবেষনা করে। ওবামা না ম্যাককেইন, কার কপালে শিকে জুটবে - সেটা তাদের চলে তুমুল আলোচনা। কে প্রেসিডেন্ট হলে কি নীতি নেবে এসবেও তাদের আগ্রহের কমতি নেই। তাদের বাবাও যোগ দেয় তাদের আলাপচারিতায়। কিন্তু যেই বাংলাদেশের রাজনীতির প্রসংগ উঠানোর চেষ্টা আমি করি তেমনি এরা সবাই চুপসে যায় ফাটা বেলুনের মত। আমি রাগ করে তাদের বাবাকে বলি,"এরা না হয় আমেরিকান। কিন্তু তুমি কেন বাংলাদেশ বাদ দিয়ে আমেরিকার রাজনীতি নিয়ে এত ভাবছ।" তাদের বাবার তখন সহজ জবাব, "যেখানে আছি সেখানকারটাই তো বেশী গুরুত্বপূর্ন।" বলা বাহুল্য আমি তার সাথে এ ব্যপারে মোটেও একমত নই।
আর দশটা মায়ের মতই আমি খুব সাধারন। তারা পরীক্ষায় খারাপ করলে আমি মন খারাপ করি, কিংবা খাওয়া দাওয়া কম করলে আমি বিরক্ত হই, অথবা সামান্য অসুখেই দুশ্চিন্তায় ভূগি। তা সত্ত্বেও আমি একটি ব্যপারে অন্যদের থেকে কিছুটা হলেও স্বতন্ত্র। তা হলো, আমি কখনও এদের উপর স্পাইং করি না। আমার প্রতিবেশীরা যেখানে তাদের সন্তানদের ফোন, ইন্টারনেট সহ প্রতিটি গতিবিধির উপর নজরদারি করে, আমি সেখানে তাদের লাগাম অনেকটাই ছেড়ে রেখেছি। এটা আমার নীতিবোধ আর রুচিবোধ - দুটোতেই বাধে। এছাড়া আমি নিজেও ছোটবেলায় এ ব্যপারে ভূক্তভোগী ছিলাম। সে মর্ম যন্ত্রনা কি তা ভালই মনে করতে পারি। সেজন্যে আমি তাদের বিশ্বাস করতে চাই। এ সংসারে বিশ্বাস করে ঠকাও ভাল, কিন্তু অবিশ্বাস করে পাপের ভাগী হবার কোন মানে নেই। আর আমার বিশ্বাস এরা আমাকে ঠকাবে না।
এখন উঠতে হচ্ছে বাচ্চাদের স্কুল থেকে আনার জন্য। আমার অবসর কথনের আপাতত ইতি টানতে হচ্ছে। এই লেখাটা যখন শুরু করেছিলাম তখন ছিল গভীর রাত। চারিদিকের শুনশান নীরবতার এক রাত। কেমন অলৌকিক একটা অনুভূতি যেন চিন্তা চেতনাকে গ্রাস করে। যেন কবরের অসীম নির্জনতা। আর এখন যখন শেষ করছি তখন দুপুরের নির্জনতা - পুরো বাড়ীতে আমি একা। আহ, কি শান্ত সৌম্য আর প্রশান্তিদায়ক এ নির্জনতা। দুর্লভ অবসরের পাওয়া এ নির্জনতায় ব্লগের পাতা ভরে দিলাম আমার খুব সাদামাটা দিনের খুব সাদামাটা কিছু কথায়।
সেদিন থেকে আমার দিন গুলো যেন ছকে বাধা পাজল। একবার সলভড হয়ে গেলে সে পাজলে আর খুব বেশী বৈচিত্র্য নেই। দিনের কোন ক্ষনে আমার কি ডিউটি তা আগে ভাগে ঠিক করা এবং সে অনুযায়ী মাথায় প্রোগ্রাম করে রাখা। ফলে সকাল থেকে উঠে মোটামুটি এক ধ্যনের ব্যস্ততায় সারা দিনের সময়টা কেটে যায় অনেকটা রোবটের মত করে।
সকালের অংশটুকু দিনের অন্য সময়ের চেয়ে আমার কিছুটা বেশী ব্যস্ত যায়। ঘুম থেকে উঠে মেয়েকে গোসল করাও, ড্রেস পড়াও, স্কুলে দেবার জন্যে এদের টিফিন বানাও ইত্যাদি হাজারোটা কাজে কখন যে সময় বয়ে যায় কে জানে। বার বার ঘড়ির দিকে সকরুন ভাবে তাকিয়ে আল্লাহ আল্লাহ করি যাতে সময়ের করুনাটুকু কপালে জোটে। এদের যাতে সময়মত স্কুলে দিতে পারি। এদিকে ভেতরে ভেতরে একটা ভয় কাজ করে মেয়ে না আবার বেকে বসে স্কুলে না যাওয়ার জন্যে। এই কাজটা সে মাঝে মধ্যে করে থাকে। ঘুম থেকে উঠে ঘোষনা দেয়া যে স্কুলে যাবে না। সেসব দিন কাটে ভীষন ভয়াবহ। বহু সাধ্য সাধনার পরে, এটা ওটা কিনে দেবার প্রতিশ্রুতির পরে তাকে স্কুলে পাঠানো যায়। প্রতিটি প্রতিশ্রুত বস্তু তাকে দিতে হয় সপ্তাহ শেষ হবার আগেই।
এই ব্লগের আর দশ জনের মত আমার দুই শিশুর পাকাপোক্ত ধারনা যে আমার মাথায় গোবর ছাড়া আসলে আর কিছু নেই। ছেলে বিরক্ত হয়ে দাবী আমি অংক করিয়ে দিলে সেটা সবসময় হয় ভুল। মেয়েও মনে করে আম্মুর দেখানো পড়া টিচার ঠিক মনে করে না। গম্ভীর হয়ে সে জানায় আমার কাছে পড়তে মোটেও আগ্রহী নয়। হিউম্যান কমিউনিকেশনের পুরো ব্যপারটি আসলে ডুপ্লেক্স, মানে দ্বিপাক্ষিক। তারা আমার সংগ পছন্দ করেনা বলে আমার নিজেরও তাদের পড়াশোনা দেখানোর প্রতি বেশী আগ্রহ নেই। নিজেরা যা পারে, সেটাই তারা হোম ওয়ার্ক করে। আমি বেশী একটা নাক গলাই না। করুক, তারা নিজেদের মত করে। তবে মাঝে মাঝে কিছু বাংলা কবিতা পড়ে শোনাই। অবাক হয়ে দেখি সেটা আবার তাদের খুব আকর্ষন করে। আমি আবৃতির ঢং এ যখন বলি,
মনে ভাবিলাম মোরে ভগবান রাখিবে না মোহ গর্তে
তাই লিখে দিল বিশ্ব নিখিল দু বিঘার পরিবর্তে।
আমার ছেলে তখন নিবিষ্ট ভংগিতে শুনতে থাকে। তাদের নিষ্পাপ চোখের মুগ্ধতা আমাকে একরাশ আনন্দ দেয়। একে একে শোনাই কাজলা দিদি, পুরাতন ভৃত্য, সোনার তরী - ঠাই নাই ঠাই নাই ছোট সে তরী। তার মনোযোগের যেন অন্ত নেই। আগ্রহী শ্রোতা পেয়ে আমারও বেশ ভাল লাগে। কখনও কখনও সে আব্দার তোলে ইংরেজী করে দিতে। সহসা বাতাস ফেলি গেল শ্বাস শাখা দুলাইয়া গাছে - এর ইংরেজী কি। আমি বুঝিয়ে দেই। বলি, এটা হল মেটাফোর যা তুমি কয়েকদিন আগে পড়লে। বাতাসে শ্বাস ফেলা মানে জোড়ে বাতাস বয়ে, বুঝলে। আর মেয়ে ভাংগা ভাংগা বাংলায় আমাকে অনুকরন করার চেষ্টা করে: মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই। ট্রান্সলেশনের আব্দার সেও করে থাকে। মাঝে মাঝে আমিও পাল্টা আব্দার তুলি। তাদেরকে বলি, বাংলা বোঝার চেষ্টা করতে। কিন্তু অবধারিত ভাবেই আমিই সবসময় হেরে যাই তাদের কাছে।
বিভোর হয়ে আবৃতি শুনতে ভালবাসলেও বাংলাদেশের যে ব্যপারটিতে তাদের কোন কৌতুহল নেই - তা হল রাজনীতি। আমি বিভিন্ন সময় খালেদা, হাসিনা, মইন ইত্যাদি নামগুলো এবং তাদের তাৎপর্য এদের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছি। কিন্তু এরা মোটেও এসবে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায় নি। এটা আমার কিছুটা অবাক করে। বিশেষত আমার ছেলে যেখানে নিজের পড়ার ঘরে বাংলাদেশের ম্যাপ ঝুলিয়েছে, ক্রিকেট খেলায় বাংলাদেশের ব্যপারে সবসময়ই উৎসাহী। তাই ভেবেছিলাম হয়ত বাংলাদেশের নির্বাচন বা রাজনীতি নিয়েও কিছুটা কৌতুহল থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু হতাশ হয়ে দেখলাম সে গুড়ে বালি ছাড়া আর কিছু নেই। খালেদা হাসিনা নামগুলো পর্যন্ত শুনতে চায় না।
বাংলাদেশের রাজনীতি বিষয়ে নির্লিপ্ত হলেও এরা কিন্তু আমেরিকার রাজনীতি নিয়ে মাঝে মাঝে গবেষনা করে। ওবামা না ম্যাককেইন, কার কপালে শিকে জুটবে - সেটা তাদের চলে তুমুল আলোচনা। কে প্রেসিডেন্ট হলে কি নীতি নেবে এসবেও তাদের আগ্রহের কমতি নেই। তাদের বাবাও যোগ দেয় তাদের আলাপচারিতায়। কিন্তু যেই বাংলাদেশের রাজনীতির প্রসংগ উঠানোর চেষ্টা আমি করি তেমনি এরা সবাই চুপসে যায় ফাটা বেলুনের মত। আমি রাগ করে তাদের বাবাকে বলি,"এরা না হয় আমেরিকান। কিন্তু তুমি কেন বাংলাদেশ বাদ দিয়ে আমেরিকার রাজনীতি নিয়ে এত ভাবছ।" তাদের বাবার তখন সহজ জবাব, "যেখানে আছি সেখানকারটাই তো বেশী গুরুত্বপূর্ন।" বলা বাহুল্য আমি তার সাথে এ ব্যপারে মোটেও একমত নই।
আর দশটা মায়ের মতই আমি খুব সাধারন। তারা পরীক্ষায় খারাপ করলে আমি মন খারাপ করি, কিংবা খাওয়া দাওয়া কম করলে আমি বিরক্ত হই, অথবা সামান্য অসুখেই দুশ্চিন্তায় ভূগি। তা সত্ত্বেও আমি একটি ব্যপারে অন্যদের থেকে কিছুটা হলেও স্বতন্ত্র। তা হলো, আমি কখনও এদের উপর স্পাইং করি না। আমার প্রতিবেশীরা যেখানে তাদের সন্তানদের ফোন, ইন্টারনেট সহ প্রতিটি গতিবিধির উপর নজরদারি করে, আমি সেখানে তাদের লাগাম অনেকটাই ছেড়ে রেখেছি। এটা আমার নীতিবোধ আর রুচিবোধ - দুটোতেই বাধে। এছাড়া আমি নিজেও ছোটবেলায় এ ব্যপারে ভূক্তভোগী ছিলাম। সে মর্ম যন্ত্রনা কি তা ভালই মনে করতে পারি। সেজন্যে আমি তাদের বিশ্বাস করতে চাই। এ সংসারে বিশ্বাস করে ঠকাও ভাল, কিন্তু অবিশ্বাস করে পাপের ভাগী হবার কোন মানে নেই। আর আমার বিশ্বাস এরা আমাকে ঠকাবে না।
এখন উঠতে হচ্ছে বাচ্চাদের স্কুল থেকে আনার জন্য। আমার অবসর কথনের আপাতত ইতি টানতে হচ্ছে। এই লেখাটা যখন শুরু করেছিলাম তখন ছিল গভীর রাত। চারিদিকের শুনশান নীরবতার এক রাত। কেমন অলৌকিক একটা অনুভূতি যেন চিন্তা চেতনাকে গ্রাস করে। যেন কবরের অসীম নির্জনতা। আর এখন যখন শেষ করছি তখন দুপুরের নির্জনতা - পুরো বাড়ীতে আমি একা। আহ, কি শান্ত সৌম্য আর প্রশান্তিদায়ক এ নির্জনতা। দুর্লভ অবসরের পাওয়া এ নির্জনতায় ব্লগের পাতা ভরে দিলাম আমার খুব সাদামাটা দিনের খুব সাদামাটা কিছু কথায়।
Tuesday, September 16, 2008
আমার অভিজ্ঞতায় জন হপকিন্সের ট্যালেন্ট সার্চ প্রোগ্রামের কথা
কে কবে প্রথম বলেছিল জন হপকিন্সের ট্যালেন্ট সার্চ প্রোগ্রামের কথা, তা সম্পূর্ন ভুলে গিয়েছি। কিন্তু আমার মাথায় গেথে গিয়েছিলো এই ট্যালেন্ট সার্চ প্রোগ্রামের কথা। শোনার সাথে সাথে একটি অসম্ভব ভাবনা মনে উকি দিয়ে যায়। আহা! যদি আমার ছেলেটা ট্যালেন্ট হতে পারত। আনমনে আবার নিজেই হাসি। সে তো আর ততটা ভাল স্টুডেন্ট নয়। অন্তত ট্যালেন্ট হবার মত আহামরি ভাল নয়। ক্লাশে মোটামুটি ভাল করলেও একদম প্রথমে নেই। তাও মনে করলাম, চেষ্টা করে দেখি। চেষ্টাতে কি না হয়। সে লক্ষ্যেই তার বাবাকে বললাম টেস্ট দেয়া যায় কিনা সেটা দেখতে। আমাদের জন্য একটু দূরে হয়ে যায় জন হপকিন্স। কিন্তু মানুষ সেই কতদূর থেকে এসে এই পরীক্ষা দিয়ে যায়। আমরা তবে কেন পারব না? পারতেই হবে।
টেস্ট দেয়াটাও ছিল বহু ঝক্কির। এই টেস্ট দিতে হলে চাই অন্য টেস্টে ৯৮% স্কোর। ভাগ্য ভাল ছিল। ক্যাট, অর্থ্যাৎ ক্যালিফোর্নিয়া এচিভমেন্ট টেস্টে আমার ছেলে আবদুল্লাহ ম্যাথ পার্টে ৯৮% স্কোর করেছিল। সেটা দিয়ে চেষ্টা করলাম। ভাগ্য ছিল প্রসন্ন। রেজিস্ট্রেশন করা গেল। সাত্ত্বনা পেলাম। যাক, অন্তত টেস্ট দিতে পারবে। সেটাই বা কম কি? একটা বাধা তো সামনে থেকে গেল।
পরীক্ষার ঠিক আগে আগে একটা স্যাম্পল প্রশ্ন পেলাম হপকিন্স থেকে। প্রশ্ন থাকে এদের দুই ক্লাশ উপরের স্ট্যান্ডার্ডের। প্রশ্ন দেখে প্রাকটিস করানোর কথা ভাবলাম। কিন্তু সে গুড়ে পড়ল বালি। এক ভাবী, যার ছেলে এই পরীক্ষা দিয়েছিল, তার কাছ থেকে জানলাম এই পরীক্ষার জন্য আর কোন প্র্যাকটিস ম্যাটেরিয়াল নেই। হপকিন্স থেকে যা পাঠিয়েছে ততটুকু ছাড়া আর কিছু কোথাও পাওয়া যায় না। এই পরীক্ষার জন্য আলাদা করে প্রিপারেশনের কোন ব্যাপার নেই।
পরীক্ষার সময় এল। পরীক্ষা দিল। ফলাফল অপ্রত্যাশিত ছিল না। ম্যাথ পার্টে ৯০ এর উপরে স্কোর করেছে। অর্থ্যাৎ শতকরা ৯০ ভাগ ছেলে তার নীচে। আমেরিকানদের ম্যাথের জ্ঞান একটু নীচের দিকে। তাই সেটাতে এশিয়ানরা এগিয়ে থাকে স্বাভাবিক ভাবেই। কিন্তু ল্যাংগুয়েজ আর্টস এ আমার ছেলে তেমন সুবিধা করতে পারে নি। সেটাতে আবার আমেরিকানদের জয় জয়কার।
সে বছর ট্যালেন্ট হতে পারল না। কি আর করা। পরের বছরের জন্য প্রস্তুতি নিলাম। এর মধ্যে আমার চেষ্টা চলল ল্যাংগুয়েজ আর্টস নিয়ে। বিভিন্ন বই দিয়ে প্র্যাকটিস তাকে করালাম। কিন্তু সেবারও একই অবস্থা। ম্যাথে কোয়ালিফাই করলেও, ল্যাংগুয়েজ আর্টসে নয়।
নাহ, এবার পেতেই হবে। জেদ চেপে গেল। চলল প্রস্তুতি। ইতিমধ্যে স্কুলে স্পেলিং বি প্রতিযোগিতায় তৃতীয় হয়ে সেও কিছুটা আত্মবিশ্বাসী। সবমিলিয়ে আমার মনে হচ্ছিল সে এবার অবশ্য অবশ্য দুটোতেই নির্বাচিত হয়ে ট্যালেন্ট হবে। তৃতীয় বারের মত সে ট্যালেন্ট সার্চের পরীক্ষা দিল।
শেষ পর্যন্ত আনন্দময় সংবাদটি আমার জীবনে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিল। সে ট্যালেন্ট হল। যদিও ল্যাংগুয়েজ আর্টস এ ন্যুনতম নম্বর পেয়ে কোয়ালিফাই করেছে। তাতে কি। ট্যালেন্ট তো হয়েছে।
তবুও ভাগ্যের বিড়ম্বনা যেন লেগেই থাকে। ট্যালেন্ট অনুষ্ঠানের দিনে জন হপকিন্সে আমরা পৌছালাম বেশ দেরী করে। বাল্টিমোরের রাস্তায় আমরা হারিয়ে প্রায় আধা ঘন্টা দেরীতে পৌছি। ততক্ষনে তার নাম ডাকা শেষ। এত খারাপ লাগল আমার। পরে অবশ্য কর্তৃপক্ষকে ধরে আমরা তার নাম আবার ঘোষনা করাই। সে স্টেজে যায়। কিন্তু ভাগ্য এবারও বিড়ম্বিত। দেখলাম ক্যামেরা আনতে ভুলে গেছি। ট্যালেন্টের ছবি আর তোলা হল না।
ট্যালেন্ট হবার সুবাদে সামারে এবার একটা রাইটিং কোর্স নিতে দিল। অসম্ভব বেশী টিউশন। অনলাইন কোর্স অথচ টিউশন প্রায় ৮০০ ডলার। আমার সামর্থ্য সীমিত হলেও এই টাকাটা জোগাড় করলাম। না, কোর্সটা বিফলে যায় নি। খুবই চমৎকার। অনেক কিছুই সে শিখেছে। সেই কোর্সের অংশ হিসেবে সে কয়েকটি লেখা লিখে। যার একটি কবিতা রয়েছে এখানে।
যা হোক, অবশেষে শেষ হল তার প্রোগ্রাম। সেদিন তার শেষ এসাইনমেন্টটায় চোখ বুলালাম। একটি গল্প লিখেছে। পারিবারিক আবহে রচিত। এত চমৎকার হয়েছে। পড়ে খুব ভাল লাগল। ছেলের এই একটি কোর্সের অভিজ্ঞতায় এতটুকু বলতে পারি জন হপকিন্সের ট্যালেন্ট সার্চ প্রোগ্রাম একটি অতুলনীয় প্রোগ্রাম, মেধার বিকাশে যা অসম্ভব সহায়ক। আমার মত মধ্যবিত্তের হাত দিয়ে এতগুলো টাকা চলে গেলেও কোর্সের কার্যকারিতায় আমি সন্তুষ্ট ।
আজ এ পর্যন্তই। সবাইকে ধন্যবাদ পোস্ট পড়ার জন্য।
টেস্ট দেয়াটাও ছিল বহু ঝক্কির। এই টেস্ট দিতে হলে চাই অন্য টেস্টে ৯৮% স্কোর। ভাগ্য ভাল ছিল। ক্যাট, অর্থ্যাৎ ক্যালিফোর্নিয়া এচিভমেন্ট টেস্টে আমার ছেলে আবদুল্লাহ ম্যাথ পার্টে ৯৮% স্কোর করেছিল। সেটা দিয়ে চেষ্টা করলাম। ভাগ্য ছিল প্রসন্ন। রেজিস্ট্রেশন করা গেল। সাত্ত্বনা পেলাম। যাক, অন্তত টেস্ট দিতে পারবে। সেটাই বা কম কি? একটা বাধা তো সামনে থেকে গেল।
পরীক্ষার ঠিক আগে আগে একটা স্যাম্পল প্রশ্ন পেলাম হপকিন্স থেকে। প্রশ্ন থাকে এদের দুই ক্লাশ উপরের স্ট্যান্ডার্ডের। প্রশ্ন দেখে প্রাকটিস করানোর কথা ভাবলাম। কিন্তু সে গুড়ে পড়ল বালি। এক ভাবী, যার ছেলে এই পরীক্ষা দিয়েছিল, তার কাছ থেকে জানলাম এই পরীক্ষার জন্য আর কোন প্র্যাকটিস ম্যাটেরিয়াল নেই। হপকিন্স থেকে যা পাঠিয়েছে ততটুকু ছাড়া আর কিছু কোথাও পাওয়া যায় না। এই পরীক্ষার জন্য আলাদা করে প্রিপারেশনের কোন ব্যাপার নেই।
পরীক্ষার সময় এল। পরীক্ষা দিল। ফলাফল অপ্রত্যাশিত ছিল না। ম্যাথ পার্টে ৯০ এর উপরে স্কোর করেছে। অর্থ্যাৎ শতকরা ৯০ ভাগ ছেলে তার নীচে। আমেরিকানদের ম্যাথের জ্ঞান একটু নীচের দিকে। তাই সেটাতে এশিয়ানরা এগিয়ে থাকে স্বাভাবিক ভাবেই। কিন্তু ল্যাংগুয়েজ আর্টস এ আমার ছেলে তেমন সুবিধা করতে পারে নি। সেটাতে আবার আমেরিকানদের জয় জয়কার।
সে বছর ট্যালেন্ট হতে পারল না। কি আর করা। পরের বছরের জন্য প্রস্তুতি নিলাম। এর মধ্যে আমার চেষ্টা চলল ল্যাংগুয়েজ আর্টস নিয়ে। বিভিন্ন বই দিয়ে প্র্যাকটিস তাকে করালাম। কিন্তু সেবারও একই অবস্থা। ম্যাথে কোয়ালিফাই করলেও, ল্যাংগুয়েজ আর্টসে নয়।
নাহ, এবার পেতেই হবে। জেদ চেপে গেল। চলল প্রস্তুতি। ইতিমধ্যে স্কুলে স্পেলিং বি প্রতিযোগিতায় তৃতীয় হয়ে সেও কিছুটা আত্মবিশ্বাসী। সবমিলিয়ে আমার মনে হচ্ছিল সে এবার অবশ্য অবশ্য দুটোতেই নির্বাচিত হয়ে ট্যালেন্ট হবে। তৃতীয় বারের মত সে ট্যালেন্ট সার্চের পরীক্ষা দিল।
শেষ পর্যন্ত আনন্দময় সংবাদটি আমার জীবনে শান্তির পরশ বুলিয়ে দিল। সে ট্যালেন্ট হল। যদিও ল্যাংগুয়েজ আর্টস এ ন্যুনতম নম্বর পেয়ে কোয়ালিফাই করেছে। তাতে কি। ট্যালেন্ট তো হয়েছে।
তবুও ভাগ্যের বিড়ম্বনা যেন লেগেই থাকে। ট্যালেন্ট অনুষ্ঠানের দিনে জন হপকিন্সে আমরা পৌছালাম বেশ দেরী করে। বাল্টিমোরের রাস্তায় আমরা হারিয়ে প্রায় আধা ঘন্টা দেরীতে পৌছি। ততক্ষনে তার নাম ডাকা শেষ। এত খারাপ লাগল আমার। পরে অবশ্য কর্তৃপক্ষকে ধরে আমরা তার নাম আবার ঘোষনা করাই। সে স্টেজে যায়। কিন্তু ভাগ্য এবারও বিড়ম্বিত। দেখলাম ক্যামেরা আনতে ভুলে গেছি। ট্যালেন্টের ছবি আর তোলা হল না।
ট্যালেন্ট হবার সুবাদে সামারে এবার একটা রাইটিং কোর্স নিতে দিল। অসম্ভব বেশী টিউশন। অনলাইন কোর্স অথচ টিউশন প্রায় ৮০০ ডলার। আমার সামর্থ্য সীমিত হলেও এই টাকাটা জোগাড় করলাম। না, কোর্সটা বিফলে যায় নি। খুবই চমৎকার। অনেক কিছুই সে শিখেছে। সেই কোর্সের অংশ হিসেবে সে কয়েকটি লেখা লিখে। যার একটি কবিতা রয়েছে এখানে।
যা হোক, অবশেষে শেষ হল তার প্রোগ্রাম। সেদিন তার শেষ এসাইনমেন্টটায় চোখ বুলালাম। একটি গল্প লিখেছে। পারিবারিক আবহে রচিত। এত চমৎকার হয়েছে। পড়ে খুব ভাল লাগল। ছেলের এই একটি কোর্সের অভিজ্ঞতায় এতটুকু বলতে পারি জন হপকিন্সের ট্যালেন্ট সার্চ প্রোগ্রাম একটি অতুলনীয় প্রোগ্রাম, মেধার বিকাশে যা অসম্ভব সহায়ক। আমার মত মধ্যবিত্তের হাত দিয়ে এতগুলো টাকা চলে গেলেও কোর্সের কার্যকারিতায় আমি সন্তুষ্ট ।
আজ এ পর্যন্তই। সবাইকে ধন্যবাদ পোস্ট পড়ার জন্য।
Thursday, September 4, 2008
My Du’a- What do I ask from Allah (SWT)?
My son's essay when he was in third grade.
==========================================================
My Du’a- What do I ask from Allah (SWT)?
In the name of Allah the most Compassionate and the most Caring. All praise be upon Him, the Lord of the worlds, the Compassionate and Merciful. There is no God except Allah alone, no partner for Him, for Him the Kingdom and the praise. He causes life and He causes death, He is living and He will not die, in His hand, is all good, over all things He is powerful. These facts tell you that Allah (SWT) is all powerful and He is the One Who can accept your Du’a.
Now I will tell you what I’ m going to ask from Allah (SWT). The first thing I ask from Allah (SWT) is to accept all my Du’as and Ibadah. Next I pray to Allah to always stay as a Muslim and be pure all the time. I ask for the ability to remind people of Islaam. I want Allah to help me break the spells, traps, and weapons of Shaytan. I also ask Allah (SWT) to help me break this spell that fools me of saying that TV is called Television but it’s not, it’s really called Televice.
I want to be a Muslim scholar with honesty and manners. Also I ask from Allah (SWT) to be a Hafiz and at the same time I want Allah to give me a good beautiful voice. I ask from Allah (SWT) to have good young children when I grow up.
Next I want something for my relatives. I ask Allah to always love my parents. I ask from Allah to make my parents not sad but happy and also to make them stop arguing over every thing.
Next I want Allah (SWT) to make my sister more of a sharing and more polite. I want Allah (SWT) to give all my relatives a good peaceful life. I wish I can live in Bangladesh so I can be with my relatives. I pray to Allah (SWT) to give Jannah to my dead relatives, specially my Grandmother.
My Du’a next is for Muslim Ummah. I pray to Allah (SWT) to help every Muslim take a breeze in the Day of Doom and die in peace. I want Allah (SWT) to help the Muslims hide each others’ mistakes (what they did wrong). I also ask Allah to make the Muslim Ummah clean and give them ‘Sabr’. I pray to Allah to make school a better school. Also I want from Allah (SWT) to bless Prophet Muhammad (S) and all the Prophets and Messengers.
Finally, I ask Allah to erase the sins of the whole mankind and give them guidance and accept all their good deeds (Pray Salat, Pay Zakat, fast in the month of Ramadan, and make Hajj) and other good deeds as well. I also want from Allah to give the whole world a good life. “Rabba Na Atina Fiddunnia hasanatow wa fil Akhira ta hasanatow Wa ki Na adhabinnar.”
Assalaamu Alykum.
[This essay is primarily done by me and my parents helped me in organization.]
==========================================================
My Du’a- What do I ask from Allah (SWT)?
In the name of Allah the most Compassionate and the most Caring. All praise be upon Him, the Lord of the worlds, the Compassionate and Merciful. There is no God except Allah alone, no partner for Him, for Him the Kingdom and the praise. He causes life and He causes death, He is living and He will not die, in His hand, is all good, over all things He is powerful. These facts tell you that Allah (SWT) is all powerful and He is the One Who can accept your Du’a.
Now I will tell you what I’ m going to ask from Allah (SWT). The first thing I ask from Allah (SWT) is to accept all my Du’as and Ibadah. Next I pray to Allah to always stay as a Muslim and be pure all the time. I ask for the ability to remind people of Islaam. I want Allah to help me break the spells, traps, and weapons of Shaytan. I also ask Allah (SWT) to help me break this spell that fools me of saying that TV is called Television but it’s not, it’s really called Televice.
I want to be a Muslim scholar with honesty and manners. Also I ask from Allah (SWT) to be a Hafiz and at the same time I want Allah to give me a good beautiful voice. I ask from Allah (SWT) to have good young children when I grow up.
Next I want something for my relatives. I ask Allah to always love my parents. I ask from Allah to make my parents not sad but happy and also to make them stop arguing over every thing.
Next I want Allah (SWT) to make my sister more of a sharing and more polite. I want Allah (SWT) to give all my relatives a good peaceful life. I wish I can live in Bangladesh so I can be with my relatives. I pray to Allah (SWT) to give Jannah to my dead relatives, specially my Grandmother.
My Du’a next is for Muslim Ummah. I pray to Allah (SWT) to help every Muslim take a breeze in the Day of Doom and die in peace. I want Allah (SWT) to help the Muslims hide each others’ mistakes (what they did wrong). I also ask Allah to make the Muslim Ummah clean and give them ‘Sabr’. I pray to Allah to make school a better school. Also I want from Allah (SWT) to bless Prophet Muhammad (S) and all the Prophets and Messengers.
Finally, I ask Allah to erase the sins of the whole mankind and give them guidance and accept all their good deeds (Pray Salat, Pay Zakat, fast in the month of Ramadan, and make Hajj) and other good deeds as well. I also want from Allah to give the whole world a good life. “Rabba Na Atina Fiddunnia hasanatow wa fil Akhira ta hasanatow Wa ki Na adhabinnar.”
Assalaamu Alykum.
[This essay is primarily done by me and my parents helped me in organization.]
Subscribe to:
Posts (Atom)
